বিশেষ প্রতিবেদক: বিশ্ববাজার থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না সরকারের। জরুরি ভিত্তিতে সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় দুটি প্রতিষ্ঠানের ক্রয় প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হয়েছে ১২ মার্চ। কিন্তু এখনো ওই দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সরকারকে কোনো পারফরম্যান্স গ্যারান্টি বা পিজি (জামানত) দিতে পারেনি। তাদের বারবার তাগাদা দিয়েও সরকারি ক্রয়ের অন্যতম শর্ত পিজি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তাদের এলসিও করতে পারছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে ওই দুই কোম্পানির একটি এ অ্যান্ড এ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস লিমিটেডের স্থানীয় এজেন্ট এবং মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান এমএফ কামাল বুধবার বলেছেন, পিজি দিতে এ অ্যান্ড এ এনার্জির প্রিন্সিপালকে বলা হয়েছে। ব্যাংক বন্ধ থকার কারণে পিজি দেওয়া যাচ্ছে না।
সরাসরি ক্রয়ের আওতায় আরও তিন কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের বেরিনজিয়া, ম্যাক্সওয়েল এবং সুরপাস্টার গ্রুপের প্রস্তাব বিবেচনা করতে কাজ করছে জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসি। এ কারণে বন্ধের দিনেরও জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম এবং বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বৈঠক করেছেন। আগের দুই কোম্পানি এখনো টাকা জমা দিতে পারেনি, এর মধ্যে অন্য কোম্পানির প্রস্তাব সরকার বিবেচনা করছে কিভাবে। এই প্রশ্নের উত্তরে জ্বালানি সচিব যুগান্তরকে বলেন, আগের দুই কোম্পানি তো এখনো পিজি দেয়নি। তাই নতুন প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রস্তাব দিলেই যে গ্রহণ করা হবে তা নয়। সরকারি সব নিয়ম প্রতিপালন না করলে তো কোনো লাভ হবে না।
বিপিসি জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের মজুত মোটামুটি আছে। ঈদের আগে আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করে পেট্রোলপাম্পগুলোকে তেল দেওয়া হচ্ছে। ২৬ ও ২৭ মার্চ ডিজেলবাহী দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়বে। এরপর ২৭ মার্চের পর ৬০ হাজার টন ডিজেল দিতে এ অ্যান্ড এ এনার্জি এবং পেট্রোগ্যাস লিমিটেডকে অনুরোধ করা হয়। এর মধ্যে কেউ তেল দিতে রাজি হয়নি এখনো। উপরন্তু তারা এখনো পিজি দিতে পারেনি। তেল সরবরাহের প্রস্তাব অনুযায়ী এ অ্যান্ড এ এনার্জির ৭৫ কোটি এবং পেট্রোগ্যাসের ১২০ কোটি টাকার বেশি পিজি বা জামানত বিপিসির কোষাগারে দেওয়ার কথা।
এ অ্যান্ড এ এনার্জি ১ লাখ টন ডিজেল এবং ২৫ হাজার টন অকটেন আনার প্রস্তাব ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন হয় ১২ মার্চ। ওই কমিটির সভায় পেট্রোগ্যাসের ২ লাখ টন ডিজেল আনার প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছিল। জরুরি ভিত্তিতে তেল আনতে ইফতারের পর জুমে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে দুই কোম্পানির প্রস্তাব অনুমোদন হওয়ার ২-৩ ঘণ্টা পরই বিপিসি থেকে রাত ১১টায় দুই আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে নো অবজেকশন পত্র-নোয়া দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় (ডিপিএম) ওই তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এরপর এখন তাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। মার্চে তারা তেল সরবরাহ দিতে পারবে না। এখন এপ্রিলে দিতে পারবে কিনা তাও জানাচ্ছে না। এ অ্যান্ড এ এনার্জির প্রস্তাবে বলা হয়েছে প্রতি ব্যারেল তেল মাত্র ৭৫ ডলারে বাংলাদেশ সরকারকে সরবরাহ করবে। এজন্য কোনো জাহাজ ভাড়া বা ফ্রেইট চার্জ লাগবে না। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান যুগান্তরকে বলেন, পিজি নিয়ে কাজ চলছে। আশা করছি ২৫ মার্চের মধ্যে এটি জমা দিতে পারব। এজন্য প্রিন্সিপালকে (মূল সরবরাহকারী) বলা হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখন ১৮০ ডলার (প্ল্যাটস অনুযায়ী)। আর এ অ্যান্ড এ এনার্জি মাত্র ৭৫ ডলারে কিভাবে দেবে। এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের কেনা আছে। আর এ নিয়ে এত কথা বলতে চাই না। এ অ্যান্ড এ কোন দেশ থেকে তেল দেবে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেন, পরে কথা বলব।
এ অ্যান্ড এ এনার্জি ছাড়া পেট্রোগ্যাস প্লাটসের নির্ধারিত মূল্যের ফর্মুলা এবং জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য খরচ হিসাবে প্রতি ব্যারেল ৪ দশমিক ৭২ ডলারে বিক্রির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিপিসি এখন তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তেল কিনতে ফ্রেইট চার্জ দিচ্ছে প্রায় ৫ ডলার। প্ল্যাটসের ক্রয় ফর্মুলা এবং ৫ ডলারে নিয়মিত সরবরাহকারীরা তেল দিতে গড়িমসি করছে বলে অন্যদের কাছ থেকে তেল কিনছে সরকার। এমনই আরও তিনটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে সরকার। ওই তিন কোম্পানি থেকে কত দামে কীভাবে তেল কিনবে তা নিয়ে সমাঝোতা বৈঠক হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রস্তাবকারীদের মধ্যে।
সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় তেল কেনার খবর শুনে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে বিপিসিতে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল এনে দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়ে সরকারের কাছে প্রস্তাব পড়েছে ১৫টির বেশি। বিপিসি বলছে, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সবাই এখন তেলের ব্যবসা করতে চায়। অনেকটা আদার ব্যাপারি জাহাজের খবর নিয়ে ছুটে আসছে সরকারি অফিসে। কিন্তু কে আসল কে নকল তা বলা কঠিন। এতে করে অযোগ্য প্রস্তাব নিয়ে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে সরকারের।
দেশে প্রতি মাসে সাড়ে ৫ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেলের দরকার হয়। যার বেশির ভাগ হচ্ছে ডিজেল। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী মার্চ মাসে ১৭টি পার্সেল বা জাহাজ আসার কথা। এর মধ্যে ১০টি পার্সেল পাওয়া গেলেও বাকিগুলো নিয়ে কাজ করছে বিপিসি। এপ্রিলে তেল কিনতে এলসি খুলেছে ১৫টি। ইতোমধ্যে ১৩টি পার্সেল দিতে সম্মত হলেও নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে মাত্র ৩টি। এ প্রেক্ষাপটে সরকার রাশিয়া, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তেল কিনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারী ইরানে হামলার পর সারা বিশ্বে তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের উপরে গিয়ে ঠেকেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের জাহাজ চলাচল নিশ্চিত না হলে এ দাম আরও বাড়তে পারে। এতে করে বাংলাদেশের মতো তেল আমদানি নির্ভর দেশ বেশি বিপাকে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ সরকার তেল নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যদিও সরকার বলছে, এ মুহূর্তে দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুত আছে এবং কোনো সংকট নেই। তারপরও, দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের আশঙ্কায় সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার এবং বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
তেল পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
- মজুত ও সরবরাহ: সরকার দাবি করছে, দেশে আগামী এক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে এবং পরবর্তী চালানবাহী জাহাজগুলো পথে রয়েছে ফার্নেস অয়েলের মজুতও ৫৯ দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
- রেশনিং ও কড়াকড়ি: প্রাথমিক পর্যায়ে তেলের ওপর যে সাময়িক কড়াকড়ি বা রেশনিং আরোপ করা হয়েছিল, তা ১৫ মার্চ ২০২৬ থেকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, কারণ মজুত পর্যাপ্ত।
- আতঙ্কিত কেনাকাটা (Panic Buying): সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়িতে তেল নেওয়ার দীর্ঘ লাইন দেখা গিয়েছিল, যা হঠাৎ চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছিল ।
- সরকারের সতর্কতা: যুদ্ধ পরিস্থিতি অনিশ্চিত হওয়ায় সরকার সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিকল্প তেল আমদানির পথ খুঁজছে]।
- মূল্য পরিস্থিতি: সরকার আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়াচ্ছে না, জনগণের ওপর চাপ কমাতে এটি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
- মূলত, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে চাপ থাকায় সরকার সতর্ক রয়েছে, তবে বড় ধরনের সংকট এড়াতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।


