বাড়িঅর্থনীতিএলএনজি সরবরাহ আশঙ্কায় রয়েছে বাংলাদেশ

এলএনজি সরবরাহ আশঙ্কায় রয়েছে বাংলাদেশ

বি এম শফিকুল ইসলাম টিটু, সিনিয়র চীফ রিপোর্টার: মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে কাতারে, চলমান সামরিক অস্থিরতার কারণে  এলএনজি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ বড় ধরনের জ্বালানি ঝুঁকিতে পড়েছে। কাতার থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ থাকায় এবং স্পট মার্কেটে দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ায় দেশে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বড় সরবরাহকারী দেশ কাতার। দেশে আমদানীকৃত এলএনজির প্রায় ৪২ শতাংশ আসে কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি কাতার গ্যাস থেকে। কোম্পানিটির এলএনজি প্রক্রিয়াকরণ ও রফতানি শিল্প এলাকা রাস লাফান সিটিতে বুধবার রাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এটি বিশ্বে এলএনজি প্রক্রিয়াকরণের সর্ববৃহৎ স্থাপনা। রাস লাফানে হামলা কাতারের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিঘ্নিত হতে পারে। এ শঙ্কায় রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানও। এমনকি কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে এসব দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে জ্বালানি খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে কাতার ও ওমানের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত কাতার এনার্জির সঙ্গে বছরে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন থেকে সর্বোচ্চ আড়াই মিলিয়ন টন গ্যাস আমদানির চুক্তি রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ প্রতি বছর যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি করে তার ৪২ শতাংশ আসে কাতার থেকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাতার বিশ্বের বহু দেশে এলএনজির বৃহৎ সরবরাহকারী। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেও কাতার ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি সরবরাহ করে আসছে। আর দেশটির এলএনজি রফতানিসংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয় রাস লাফান সিটি থেকে। বুধবারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এ অবকাঠামো দিয়ে গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে বাংলাদেশসহ এশিয়ার অন্যান্য যেসব দেশ কাতারের এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল তারা ঝুঁকিতে পড়বে।
জ্বালানি খাতের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর মতে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তাদের এলএনজি আমদানির যথাক্রমে ৯৯ ও ৭০ শতাংশ পায় কাতার থেকে। দেশ দুটির এলএনজি আমদানির বড় অংশই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কাতার থেকে সরবরাহ দেয়া হয়।
বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে পেট্রোবাংলার সাবসিডিয়ারি রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। কোম্পানিটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাতারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সরবরাহ কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে এমন কোনো খবর তাদের কাছে নেই। এমনকি সরবরাহকারী দেশগুলোর থেকেও রফতানি হবে না এমন কোনো ধরনের বার্তা আরপিজিসিএলকে এখনো দেয়া হয়নি বলে জানান তারা।
রাস লাফান সিটিতে হামলার কারণে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিঘ্নিত হবে কিনা এমন বিষয়ে জানতে চাইলে আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, কাতার থেকে এলএনজি আমদানিতে সরবরাহ সংকটের কোনো জটিলতা নেই। সরবরাহ সংকট তৈরি হবে- কাতারের দিক থেকে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো বার্তা আমরা পাইনি।’
দেশে প্রতি বছর পাঁচ মিলিয়ন টনের বেশি এলএনজি আমদানি হয়। কার্গো হিসাবে এর পরিমাণ ৯০-এর অধিক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেট্রোবাংলা ৫ দশমিক ৮০ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করেছে। এর মধ্যে কাতার থেকে আমদানি হয়েছে ২ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন টন। আর ওই অর্থবছরে কার্গোর হিসাবে ৯৪টি কার্গো এসেছে দেশে। এর মধ্যে কাতার থেকে এসেছে ৪০টি।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার ১১৫টি কার্গো কেনার প্রাক্কলন রয়েছে। এর মধ্যে কাতার থেকে আসার কথা ৪০টি কার্গো। আরপিজিসিএলের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, কাতার থেকে ৪০ কার্গো এলএনজির মধ্যে জানুয়ারি পর্যন্ত ২৪ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। এর আগে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা করলে পাল্টা হামলা হিসেবে কাতারের রাস লাফান সিটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। গত ২ মার্চ এ হামলার ফলে কাতারের এলএনজি উৎপাদন ও রফতানিসংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেয় দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়। পরবর্তী সময়ে স্বল্প পরিসরে রফতানিসংক্রান্ত কার্যক্রম চালু হয়। এর মধ্যে বুধবার রাতে দ্বিতীয় দফায় বিস্তৃতভাবে রাস লাফান সিটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। এবারের হামলায় কাতারের এলএনজি অবকাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অবকাঠামোর এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন।
দেশে বিদ্যুৎ ও শিল্প-কারখানা সচল রাখতে স্থানীয় গ্যাসের পাশাপাশি এলএনজির বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। দৈনিক অন্তত ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশের। সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি তৈরি হলে তা বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতি গভীর করে তুলতে পারে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।
ইরান সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের পাশাপাশি এলএনজির দামও আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে খোলাবাজারে (স্পট মার্কেট) এলএনজি প্রতি ব্রিটিশ মিলিয়ন থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ২০ ডলার ১৭ সেন্টে ওঠানামা করছে, যা গত মাসে একই দিনে ছিল ১০ দশমিক ৭৮ ডলার। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে এলএনজির দাম স্পট মার্কেটে দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
গত ১১ মার্চ বাংলাদেশ খোলাবাজার থেকে তিন কার্গো এলএনজি ক্রয় করেছে। যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম পড়েছে ২১ ডলার ৫৮ সেন্ট। টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার থেকে এ দরে এক কার্গো এলএনজি কেনা হয়। অন্য দুটি কার্গোর প্রতি এমএমবিটিইউ দাম পড়েছে ২০ ডলার ৭৬ সেন্ট। মোট তিন কার্গো এলএনজি কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর পর কাতার থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ রয়েছে। কবে থেকে সরবরাহ শুরু হবে সেটাও অনিশ্চিত। আমরা তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি, তবে কবে নাগাদ সরবরাহ ঠিক হবে সেই নিশ্চয়তা তারা দিতে পারছে না। কাতারের এলএনজি সরবরাহ সংকট স্পট মার্কেট থেকে পূরণ করা হচ্ছে।’

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Recent Comments