বি এম শফিকুল ইসলাম টিটু, সিনিয়র চীফ রিপোর্টার: পশ্চিম এশিয়ার সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়তে পড়তে এ বার পৌঁছে গেল শ্রীলঙ্কার উপকূলেও। ভারত মহাসাগরের বুকে ইরানি যুদ্ধজাহাজকে ধ্বংস করেছে আমেরিকা। বুঝিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমাতেও নিরাপদ নয় ইরান। এত দিন সীমিত ছিল পশ্চিম এশিয়ার মধ্যেই। এ বার আমেরিকা-ইরান সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ল পশ্চিম এশিয়ার বাইরেও। ভারত মহাসাগরের বুকে ইরানের যুদ্ধজাহাজ ডোবাল আমেরিকা। তা-ও শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছেই। সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানাচ্ছে, সম্প্রতি ভারতের আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক নৌমহড়ায় অংশগ্রহণ করেছিল ইরানি যুদ্ধজাহাজটি। যদিও প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত ভারতীয় নৌসেনার তরফে এ বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ দিকের বন্দর শহর গল থেকে মাত্র ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে ইরানি রণতরীটিকে ডুবিয়েছে আমেরিকা। ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৮৭ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। জখম অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ৩২ জনকে।
বুধবার ভোরের দিকে হামলাটি হয়েছিল শ্রীলঙ্কার উপকূলে। কিন্তু কে বা কারা হামলা চালিয়েছে, তা প্রাথমিক ভাবে স্পষ্ট ছিল না। যদিও শ্রীলঙ্কার নৌসেনা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে জানা যায়, কোনও এক ডুবোজাহাজই হামলা করেছে ইরানের রণতরীতে। পরে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। মার্কিন আধিকারিক সূত্রে রয়টার্স দাবি করে, ওই হামলা চালিয়েছে আমেরিকাই। ঘটনাচক্রে, এর অব্যবহতি পরেই পেন্টাগনও স্বীকার করে নেয় হামলার কথা। যদিও সরাসরি শ্রীলঙ্কা উপকূলের কথা উল্লেখ করেনি তারা।
ইরানের ওই ডুবন্ত জাহাজ থেকে নৌসেনা কর্মীদের উদ্ধার করে শ্রীলঙ্কাই। শ্রীলঙ্কার নৌসেনার কাছেই সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করেছিল ইরানের ওই জাহাজটি। পরে শ্রীলঙ্কার বিদেশমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ জানান, ইরানের ওই ‘আইআরআইএস ডেনা’ জাহাজটিতে ১৮০ জন ছিলেন। দেশের দক্ষিণ দিকের বন্দর শহর গল থেকে ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল জাহাজটি। ডুবন্ত সেই জাহাজটি থেকে ভোর ৫টা ৮ মিনিটে (শ্রীলঙ্কার সময় অনুযায়ী) সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠানো হয় শ্রীলঙ্কার বাহিনীকে।
-
ইরানের ২০০০ জায়গায় হামলা:
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর থেকে ইরানের দু’হাজার জায়গায় হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। শুধু তা-ই নয়, সে দেশের নৌসেনার একটি ডুবোজাহাজ-সহ মোট ১৭টি জাহাজ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এমনটাই দাবি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর। একইসঙ্গে তারা দাবি করেছে, বি১, বি২ বম্বার দিয়ে ইরানের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ও করা হয়েছে। মার্কিন নৌসেনাকর্তা অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের কথায়, ‘‘ইরানের নৌসেনাকে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছি আমরা। গোটা নৌবাহিনীকে ডুবিয়ে ছাড়ব। ইতিমধ্যেই ১৭টি জাহাজকে ধ্বংস করা হয়েছে। একটি সাবমেরিনকেও নিশানা বানানো হয়েছে।’’
-
হরমুজ় প্রণালীতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ইরানের:
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) ঘোষণা করেছে যে, হরমুজ প্রণালী এখন তাদের “পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে” রয়েছে এবং সেখান দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না।গত কয়েক দিনের হামলায় ইরানের বিভিন্ন জায়গায় বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে। তবে ইরানও প্রত্যাঘাত চালিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার ‘বন্ধু’ দেশগুলির উপর ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে তারা। অবরুদ্ধ করে রেখেছে হরমুজ় প্রণালীও। ধারাবাহিক ড্রোন হামলা হরমুজ় প্রণালীকে আগামী কয়েক মাস ধরে স্তব্ধ করে রাখতে পারে। ড্রোন প্রস্তুতকারক দেশগুলির মধ্যে বিশ্বের প্রথম সারিতে রয়েছে ইরান। প্রতি মাসে তেহরান প্রায় ১০ হাজার ড্রোন তৈরির ক্ষমতা রাখে। তাদের কত ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে, তা অস্পষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলির কাছে। তবে ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের পাল্লা ৭০০-১,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। যা ইরানের মূল ভূখণ্ড বা জাহাজ থেকে উৎক্ষেপণ করা হলে পারস্য এবং ওমান উপসাগরীয় অঞ্চলের যে কোনও লক্ষ্যে আঘাত হানার জন্য যথেষ্ট।
বুধবারই ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড’ দাবি করেছে, তারা হরমুজ় প্রণালী ‘সম্পূর্ণ দখল’ করে নিয়েছে। সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই মাথায় হাত পড়েছে বিশ্বের অনেক দেশের। বর্তমানে হরমুজ় প্রণালীকে ঘিরে রয়েছে শ’য়ে শ’য়ে জাহাজ। না-এগোতে পারছে, না-পিছোতে! ইরানের জারি করা বিধিনিষেধের কারণে হরমুজ় প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্তব্ধ। সেই ভিড়ে রয়েছে মার্কিন জাহাজও।
-
টাকার দামে সর্বকালীন পতন:
পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ধাক্কা খেয়েছে টাকার দামও। বুধবার সকালে বাজার খোলার সময়ে এক লাফে ৬৯ পয়সা বেড়ে ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার বিনিময়মূল্য দাঁড়ায় ৯২.১৮ টাকা। সাম্প্রতিক অতীতে ডলারের তুলনায় টাকার দামে এতটা পতন দেখা যায়নি। গত জানুয়ারিতে ডলার-টাকার বিনিময়মূল্য সবচেয়ে খারাপ পতন হয়েছিল (বিনিময়মূল্য ৯১.৯৮ টাকা)। সে দিক থেকে বুধবারের পতনই সর্বকালীন নজির বলে ব্যাখ্যা করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণেই এই ধাক্কা খেয়েছে ভারতীয় মুদ্রার দাম। আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে গিয়েছে। অশোধিত তেলের উর্ধ্বমুখী দামই টাকার দরের পতন ঘটিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বস্তুত, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনার মাঝে ব্রেন্ট অশোধিত তেলের দাম গত দু’দিনে প্রায় ১২-১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যারেলপিছু তেলের দাম ৮২ ডলার ছাপিয়ে গিয়েছে, যা ২০২০ সালের পর থেকে সর্বাধিক।
-
বিমান টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া:
গোটা পশ্চিম এশিয়া জুড়ে এক সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিমান পরিষেবাতেই। বস্তুত, দুবাই, আবুধাবি-সহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন বিমানবন্দরগুলি হল আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের হাব। ভারত থেকে ইউরোপ এবং আমেরিকার বিমানগুলি এই অঞ্চল হয়েই যাতায়াত করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিমানভাড়া আকাশছোঁয়া হয়ে গিয়েছে। দিল্লি থেকে লন্ডনগামী বিমানের ভাড়া লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে গত কয়েক দিনে। এয়ার ফ্রান্স, এমিরেটসের মতো সংস্থাগুলির বিমান ভাড়া দুই থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। এয়ার ফ্রান্সের বিমানগুলি দিল্লি থেকে রওনা দিয়ে প্যারিসে পৌঁছোচ্ছে। সেখান থেকে আমস্টারডম হয়ে লন্ডনে নামছে। ফলে সময় লাগছে ২০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট। অন্য দিকে এমিরেটসের যে বিমানগুলি দিল্লি থেকে রওনা হচ্ছে, সেগুলি প্রথমে দুবাইয়ে অবতরণ করছে। তার পর সেখান থেকে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে যাচ্ছে। এই সফরের সময় লাগছে প্রায় ২২ ঘণ্টা মতো। টিকিটের দামও দিন অনুযায়ী বদলাচ্ছে। বর্তমানে এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত। ০৪ মার্চ ২০২৬তারিখের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে ভারত মহাসাগর তথা শ্রীলঙ্কার উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে এবং ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
-
শ্রীলঙ্কার উপকূলে সংঘাত:
- ইরানি জাহাজ ধ্বংস: শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থানরত একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজকে (IRIS Dena) মার্কিন সাবমেরিন টর্পেডো মেরে ডুবিয়ে দিয়েছে।
- প্রথম ঘটনা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন সাবমেরিন টর্পেডো ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের জাহাজ ডুবালো ।
- হতাহত: এই হামলায় ৮০ জনেরও বেশি ইরানি নৌসেনা নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে ।
- হামলার হুমকি: ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, এই পথ দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করলে যেকোনো জাহাজে (বিশেষ করে তেলবাহী ট্যাঙ্কার) হামলা চালানো হবে।
- পরিবহনে বিপর্যয়: এই উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। প্রায় ১৫০টিরও বেশি ট্যাঙ্কার প্রণালীর বাইরে আটকা পড়ে আছে।
- বৈশ্বিক প্রভাব: জ্বালানি সংকট: বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে যায়। প্রণালীটি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে ।
- এশীয় দেশগুলোতে প্রভাব: ভারত, চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো তাদের জ্বালানি আমদানির জন্য এই রুটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
-
অনান্য সার-সংক্ষেপ তথ্য:
- ৯৫ লক্ষ ব্যারেল রুশ তেল নিয়ে ভারতীয় জলসীমার অদূরে ঘুরছে নৌবহর! গন্তব্য বদলে দিল্লিমুখী হতে প্রস্তুত মস্কো।
- যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৌদি ছাড়লেন রোনাল্ডো, ব্যক্তিগত বিমানে পরিবার নিয়ে মাদ্রিদে সিআর৭, বিশ্বকাপের আগে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট।
- যুদ্ধ এ বার লেবাননেও? ইরানের ইসলামীয় শাসনকে নিকেশ করতে কেন পড়শি দেশে হানা।
- বৃহস্পতিবার থেকে ইজ়রায়েলে আংশিক চালু হচ্ছে বিমানবন্দর! পশ্চিম এশিয়া অব্যাহত অশান্তি।
- ইজ়রায়েলি হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেন খামেনেই-পুত্র! আয়াতোল্লার পদে নাম নিয়ে জল্পনার মধ্যেই দাবি ইরানি সূত্রে।


