বাড়িঅনুসন্ধানী সংবাদসরকারী সুযোগ ও সম্পদের অসম বণ্টন বৈষম্যবিরোধী চেতনার পরিপন্থী

সরকারী সুযোগ ও সম্পদের অসম বণ্টন বৈষম্যবিরোধী চেতনার পরিপন্থী

“অন্তর্বর্তী সরকারের ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের ৪২ শতাংশই চট্টগ্রামে! দারিদ্র্যপীড়িত রংপুরে ২.৪৪ ও ময়মনসিংহে ০.১৭ শতাংশ”

বি এম শফিকুল ইসলাম টিটু, সিনিয়র চীফ রিপোর্টার: সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেটে দেশের সব অঞ্চল সমান গুরুত্ব না পেলে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য প্রকট হতে থাকে। এতে নির্দিষ্ট অঞ্চলে পিছিয়ে পড়া ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে যায়। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেটে দেশের সব অঞ্চল সমান গুরুত্ব না পেলে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য প্রকট হতে থাকে। এতে নির্দিষ্ট অঞ্চলে পিছিয়ে পড়া ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে যায়। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে, বিধায় বেকারের সংখ্যাও বাড়ে। বিগত সরকারের আমলে এ ধরনের আঞ্চলিক বৈষম্য প্রকট রূপ নিয়েছিল, যা জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটায়। সে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবাই প্রত্যক্ষ করেছে; ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে তৎকালীন সরকার। এমনকি এ অভ্যুত্থানের সূচনাও হয়েছিল সরকারি চাকরিসহ রাষ্ট্রের নানা স্তরের বিদ্যমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে। স্বাভাবিকভাবে এরপর যখন নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়, সবার প্রত্যাশা ছিল বৈষম্য কমিয়ে আনতে সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এ সরকারের মেয়াদের প্রায় শেষ সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে, অতীতের মতোই উন্নয়ন পরিকল্পনায় বড় ধরনের বৈষম্য করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের নথিপত্র বিশ্লেষণের ভিত্তিতে জানাগেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত ১৮ মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ২০টি সভা হয়েছে। এসব সভায় ১৫৩টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে প্রায় ২ লাখ সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা, যার ৪২ শতাংশ অর্থই দেয়া হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। যদিও এ বিভাগে তুলনামূলক উন্নত ও দারিদ্র্যের হারও কম।
গত বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্যের স্থানিক মানচিত্র (পোভার্টি ম্যাপ) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষের বাস বরিশালে, ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগে এ হার সবচেয়ে কম, ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। এর পরও এ বিভাগের উন্নয়নে সবচেয়ে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বরিশালে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ। এছাড়া অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা ময়মনসিংহ বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৩৭৬ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ বলে পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প বরাদ্দের এরূপ অসম বণ্টন গণ-অভ্যুত্থানের সরকারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। এতে ভবিষ্যতে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য ও দরিদ্র আরো বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার বাড়ি চট্টগ্রাম জেলায় হওয়ায় উন্নয়ন বরাদ্দে অসম বণ্টন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অবশ্য এ সরকার গঠনের সময়ও অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্যের বিষয়টি জনপরিসরে আলোচনায় এসেছিল। প্রধান উপদেষ্টাসহ এ সরকারের প্রায় ১৩ জন শীর্ষ নীতিনির্ধারক একটি বিভাগের বলে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ থেকে কাউকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ না দেয়ায় এ অঞ্চলের সঙ্গে সরকার বৈষম্য করছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। বর্তমানে উন্নয়ন বরাদ্দের চিত্র বিচারে এ অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। দারিদ্র্যপীড়িত রংপুর বিভাগে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ অর্থ। আর রাজশাহীতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম চেতনা বৈষম্য নিরসন হলেও এ অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠন করা সরকারের আমলে আঞ্চলিক বৈষম্য বজায় রয়েছে।
বিগত ক্ষমতাচ্যুত সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনামলে উন্নয়ন বরাদ্দে উত্তরাঞ্চল বঞ্চিত হয়েছে। তৎকালীন একনেকগুলোয় রংপুর অঞ্চলের জন্য তেমন উন্নয়ন প্রকল্প ছিল না। বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর ও বগুড়া জেলায় সবচেয়ে কম বরাদ্দ রাখা হতো বলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) তথ্যে উঠে আসে। অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গোপালগঞ্জ জেলা বেশি বরাদ্দ পেয়েছিল। তৎকালীন এডিপির ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ পায় এ তিন জেলায়। অর্থাৎ সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগ ছিল ঢাকা ও দক্ষিণাঞ্চলকেন্দ্রিক।
সুযোগ ও সম্পদের অসম বণ্টন কেবল বৈষম্যবিরোধী চেতনার পরিপন্থী, তা নয়। এটি সরাসরি সংবিধান অবমাননা। দেশের সংবিধানের ১৯ নং অনুচ্ছেদের প্রথম ও দ্বিতীয় ধারায়৷উল্লেখ রয়েছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন’ এবং ‘মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন’। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নানা সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন সরকার সুযোগ-সুবিধা, সম্পদের অসম বণ্টনে অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছে। যদিও প্রকল্পের বরাদ্দে অঞ্চলভিত্তিক বড় ব্যবধান প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া প্রকল্পগুলো অঞ্চল বা ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় স্বার্থে নেয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃত আর্থসামাজিক পরিস্থিতি উপেক্ষা করে উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া কখনই জাতীয় স্বার্থকে সুরক্ষা দেবে না। একটি অঞ্চল যখন তুলনামূলক বেশি উন্নত হবে, অনুন্নত এলাকা থেকে সেখানে জনগণের স্থানান্তর তথা চাপ বাড়বে। এতে নাগরিক সুবিধা ক্রমেই অপ্রতুল হয়ে পড়বে। যার উদাহরণ রাজধানী ঢাকা। আবার স্থানান্তর না হলেও কম বরাদ্দের অঞ্চলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গতি শ্লথ হয়ে পড়বে। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, যা বেকারের সংখ্যা বাড়াবে। সেই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীও বাড়বে। বেকার ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ায়, যা জাতীয় স্বার্থেরও পরিপন্থী। আবার দেখা গেছে বেশির ভাগ প্রকল্পের ব্যয়নির্বাহ করা হবে বিদেশী অর্থায়নে। অর্থাৎ বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও আরো বেড়ে যাবে। অথচ এরই মধ্যে দেশের বৈদেশিক ঋণের চক্রে আটকে পড়েছে এবং অর্থনীতিতে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই জাতীয় স্বার্থ উল্লেখ করে অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দে বিশাল ব্যবধানকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে চাইলে প্রয়োজন সুযোগ ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Recent Comments