বাড়িঅনুসন্ধানী সংবাদবাংলাদেশের অর্থনৈতিক সেক্টরে চরম অসন্তোষ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সেক্টরে চরম অসন্তোষ

অর্থনৈতিক ডেক্স রিপোর্ট: বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শাসন ব্যবস্থায় বাংলদেশের অর্থনৈতিক সূচক এক নাটকীয় পতনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) ৮.৮ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫২.৯ পয়েন্টে, যা সম্প্রসারণ পর্ব শুরুর পর সর্বনিম্ন। পিএমআই একটি সূচক যা অর্থনীতির গতি ও দিক নির্দেশ করে, এবং এর হঠাৎ পতন দেশের ভেতরে গভীর অর্থনৈতিক টানাপড়েনের ইঙ্গিত বহন করে। এই পতনের প্রকৃত কারণ খোঁজার সময় এসেছে। কারণ সাময়িক ছুটি বা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা দিয়ে পুরো বিষয়টিকে হালকাভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে প্রশাসনিক স্থবিরতা, স্বেচ্ছাচারী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সর্বোপরি অবৈধ শাসনের পরিণাম। দেশের গায়ে এখন যে শাসক চেপে বসে রয়েছে- তার রাজনৈতিক বৈধতা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি তার নীতিগত দিকনির্দেশনাও ভয়ানক রকমের অদূরদর্শী এবং আত্মঘাতী।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় পূরো রাষ্ট্রের সকল সেক্টরকেই ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। তার ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ, আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেকে “উদ্ধারকর্তা” হিসেবে প্রমাণ করার খায়েশ এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপসহ সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক প্রকার ল্যাবের ইঁদুরে পরিণত হয়েছে।
যেখানে কৃষিখাতে প্রবৃদ্ধি তীব্র ধীরগতি, সেখানে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে কিছুটা গতি থাকলেও তা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে উঠবে যদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাষ্ট্র ক্ষমতায় চলমান সরকারের অপশাসনের অবসান না ঘটে। দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর জন্য যে স্থিতিশীলতা ও বাস্তবভিত্তিক নীতির প্রয়োজন, তা বর্তমানে অনুপস্থিত।
ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের সংগঠন এমসিসিআই এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ থেকে প্রাপ্ত পিএমআই ডেটা স্পষ্টতই দেখায়, গত বছর জুলাই মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় সূচক যেখানে ৩৬.৯ পয়েন্টে নেমেছিল, সেখানে অক্টোবরের পর থেকে কিছুটা উন্নতি হলেও তা এখন আবার অবনতির দিকে। এটি নিছক পরিসংখ্যান নয়, এটি ভবিষ্যতের চরম আর্থিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন পরিস্থিতিতে রয়েছে, যেখানে শাসনের বৈধতা যেমন নেই, তেমনি অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনার মেরুদণ্ডও ভেঙে পড়েছে। দেশের রপ্তানী নির্ভর খাতগুলোর ওপর শুল্ক চাপানো, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট নিরসনে ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মেঘ আজ অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে অন্ধকার ছড়িয়ে দিয়েছে। এবং এই অন্ধকারের জন্ম দিয়েছেন সেইসব লোক, যারা জনগণের ভোট ছাড়া ক্ষমতায় বসে আজ দেশের অর্থনৈতিক মুক্তিকে দমন করছেন।
এপ্রিলে অর্থনীতির গতি কমা একটি বিপদের ঘণ্টা। এটি এক ধরনের “অ্যালার্ম বেল” যা শোনার মতো সংবেদনশীলতা এখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের নেই। কারণ তাদের কাছে দেশের বাস্তব পরিস্থিতি নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান, পুরস্কার, সম্মাননা, বিদেশি মিডিয়ার প্রশংসা ইত্যাদিই মুখ্য।
বাংলাদেশ এখন এক সংঘাতময় মোড়ের দিকে এগোচ্ছে একদিকে রাজনৈতিক বৈধতার সংকট, অন্যদিকে অর্থনীতির পরিণত সংকোচন। এর পরিণতি হতে পারে আরও গভীর ও স্থায়ী ক্ষতি। সময় এসেছে এই ধ্বংসযজ্ঞের মূল হোতাদের দায় নির্ধারণের, এবং সত্যটি প্রকাশ্যে আনার।

বর্তমান শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি সবাইকে শঙ্কিত করে তুলছে। দেশসচেতন মানুষ যেমন এ নিয়ে চিন্তিত, তেমনি ক্রেতারাষ্ট্রও ভাবছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নিয়ে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকের বড় ক্রেতা জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফাহরেনহোলজ এক টুইটবার্তায় বলেছেন, ‘সমঝোতা করতে হবে কারখানা মালিকদের। ন্যায্য বেতন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ দিন। দুর্ঘটনার বীমা চালু করুন। সরকারের পেছনে গিয়ে লুকাবেন না।’ আরেক টুইটে তিনি লিখেছেন, ‘পুলিশ দিয়ে ধর্মঘটকারী গার্মেন্ট শ্রমিকদের দমন করা উচিত নয়। আমি এই সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায্য সমাধান প্রত্যাশা করছি।’
শিল্পমালিক ও সরকার মাধ্যমকে মনে রাখতে হবে বাংলাদেশি পোশাকশিল্পের বাজার ধ্বংস করতে পোশাক বিক্রেতা ভিনদেশি শিল্পগোষ্ঠীর কূটকচাল থাকতে পারে। আর দেশীয় সুযোগসন্ধানী অপশক্তি বিদেশিদের সঙ্গে নিয়ে বিপুল আয়ের এই শিল্প গোড়ায় ঢালতে পারে অপসন্ধিৎসুমূলক বিষাক্ত পানি। ষড়যন্ত্রকারীরা আমাদের পোশাকশিল্পের ভেতরগত ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো কাজে লাগিয়ে পোশাক শ্রমিকদের ঘুঁটির চাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা চালাবে, এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে আমাদের গর্বিত পোশাকশিল্প ও শ্রমিক সমাজকে নিয়ে ভাবতে হবে। পোশাকে কেন বারবার শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি হয় সেগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা ও সঠিক সময়ে বেতন-বোনাস প্রাপ্তির নিশ্চয়তাসহ নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো শিল্পমালিক যেন শ্রমিকদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালাতে না পারে সে দিকটাও বিবেচনায় আনতে হবে। কারণ এই সস্তা শ্রমিকই অসংখ্য শিল্প উদ্যোক্তাকে বানিয়েছে মালিক, দেশকে পাইয়ে দিচ্ছে অর্থনৈতিক সুফল। অন্যদিকে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি এই রপ্তানি খাতকে অস্থিতিশীল করতে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা যে ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছে সেগুলোর সঠিক তদন্ত শেষে দোষীদের বিচারের আওতায় আনাটা জরুরি।
বছরের শুরুতেই তৈরি পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ভালো কিছুর ইঙ্গিত বহন করছে বলে মনে হয় না। সম্প্রতি শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান কারণ বেতন বৈষম্য। ন্যূনতম ১৬ হাজার টাকা মজুরি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গেল বছরের ২৫ নভেম্বর ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করে সরকার এবং ১ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সরকারের বেঁধে দেওয়া নতুন মজুরি কাঠামোয় চলতি মাসে প্রথম মজুরি পাওয়ার পর দেখা যায়, যে হারে সপ্তম গ্রেডের মূল মজুরি বৃদ্ধি করা হয়েছে সে হারে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম গ্রেডের মজুরি বৃদ্ধি করা হয়নি। উপরন্তু শ্রমিকের নানাভাবে অন্যায়-অবিচারের শিকার হতে হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে শ্রমিকরা বছরের শুরুতেই আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছে। তাদের দাবি হচ্ছে পোশাক শ্রমিকদের সব গ্রেডে সমান হারে মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি বকেয়া বেতন পরিশোধ, ছাঁটাই ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার এক সংবাদপত্রে বলেন, ‘সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী নতুন গ্রেডে শ্রমিকরা এ মাসেই বেতন পাওয়া শুরু করেছে। মাস শেষে কাক্সিক্ষত বেতন না পাওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামে। এ ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাই, টার্গেট চাপ প্রয়োগ এবং শ্রমিকরা নির্যাতনের শিকারও হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এসব বন্ধ করতে হবে।’ অন্যদিকে নারীনেত্রী রোকেয়া কবির বলেন, ‘শ্রমিকদের বিশাল অংশকে বঞ্চিত করে, অঙ্কের মারপ্যাঁচে ফেলে বেসিক কমিয়ে দিলে শেষ পর্যন্ত শিল্পের মঙ্গল আসবে না। এ কথা মালিকপক্ষকে বুঝতে হবে। তাই চলমান আন্দোলন পরিস্থিতিতে সরকার ও মালিকপক্ষকে এক হয়ে বসে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম গ্রেডের শ্রমিকদের মূল মজুরি অন্যান্য গ্রেডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বেতন বাড়িয়ে শিল্পের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।’
তৈরি পোশাক শ্রমিক সম্প্রদায়ের সাম্প্রতিক আন্দোলনের কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেতন বৃদ্ধির বৈষম্যমূলক আচরণই তাদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে। ন্যূনতম ৮ হাজার টাকা বেতন বৃদ্ধির গ্রেডিং গিরিঙ্গি বাধিয়ে শুভঙ্করের ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে শ্রমিকদের। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ‘শ্রমিকদের বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ও খাদ্যভাতা বাড়ানো হলেও বেসিক বা মূল বেতন বাড়ানো হয়নি। উল্টো জ্যেষ্ঠ পদের দক্ষ শ্রমিকদের (৩ নম্বর গ্রেড) ২০১৩ সালের বেতন কাঠামোর তুলনায় ৪৮ টাকা মূল বেতন কমানো হয়েছে। ৪র্থ গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন বাড়ানো হয়েছে মাত্র ৮২ টাকা। ৫ম গ্রেডের বেড়েছে ১৬৮ টাকা। ২০১৩ সালের কাঠামোয় একজন শ্রমিক বেসিক পেতেন ৫ হাজার ২শ টাকা। নতুন বেতন কাঠামোয় বেসিক ধরা হয়েছে ৫ হাজার ১৫২ টাকা। এতে ৪৮ টাকা বেতন কমেছে সত্যি। কিন্তু মাসে তাদের মোট বেতন বেড়েছে ৩ হাজার টাকা।’ তবে মোট বেতনে ৩ হাজার টাকা বেড়েছে ঠিক, এতে শ্রমিকরা লাভের বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে। শ্রমিকদের ভাষ্যতেই তা পরিষ্কার। তাদের ভাষ্য, তারা দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করেন। মূল কর্মঘণ্টা তাদের ৮ ঘণ্টা। এর অতিরিক্ত ৪-৬ ঘণ্টা বাড়তি সময় শ্রমের মূল্য নির্ধারিত হয় মূল বেতনের ভিত্তিতে। একইভাবে নির্ধারিত হয় হাজিরা ও উৎসব বোনাসও। কিন্তু নতুন কাঠামোতে বেসিক না বাড়ায় নতুন নিয়মে ওভারটাইম ও উৎসব বোনাসে শ্রমিকদের ঠকানো হচ্ছে। তাই তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন। মালিকপক্ষের সুবিধার্থে নিরুপায় শ্রমিকশ্রেণিকে কৌশলে ঠকানোর এই অগ্রহণযোগ্য সমাধান দেশের রপ্তানিকারক বৃহৎ শিল্পটির জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। বরং দিন দিন শ্রমিকরা এভাবে আন্দোলনে নামবে আর সাধের সোনালি শিল্পটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়াবে। শ্রমিকের সস্তা শ্রমে যে পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ে ৮০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখছে সেই শিল্পটির প্রতি সরকার কেন এত কৃপণতা মনোভাব দেখিয়ে আসছে সেটা কারো বোধগম্য নয়। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে ৮০ শতাংশেরই বেশি রপ্তানি আয় পাওয়া বাংলাদেশই সর্বনিম্ন মজুরি প্রদান করে থাকে। এটা লজ্জাকর, অগ্রহণযোগ্য।
তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের আইকন’ হয়ে উঠেছেন বাঙ্গালী জাতির গলার কাঁটা। যত দিন এই অবৈধ ও আত্মমুগ্ধ নেতৃত্ব বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রাডার চালাবে, ততদিন গতি নয় গহ্বরই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Recent Comments