বি এম শফিকুল ইসলাম টিটু, সিনিয়র চীফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘কোনো কোনো বিশেষ মহল নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র করছে, সতর্ক থাকুন।’ শনিবার ৩১ জানুয়ারী বিকেলে টাঙ্গাইল মহাসড়কের দরুন-চরজানা বাইপাস এলাকার নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারম্যান এ আহ্বান জানান। বিকেল সাড়ে ৫টায় মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘আগামী দিন হচ্ছে দেশ গড়ার দিন, মানুষের ভাগ্য বদল করার দিন। আগামী দিন হচ্ছে মানুষের শুভ যাত্রার দিন। কাজেই আমরা যদি সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকি। আমরা যদি সকলে সতর্ক থাকি- তাহলে আমাদের এই অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, ইনশাল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘আপনাদের সকলের কাছে আমার আহ্বান থাকবে, এখনো কোনো কোনো মহল চেষ্টা করছে যে, কীভাবে ভোটকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়? তাদের বিভিন্ন লোকজন গিয়ে বিশেষ করে যারা মা-বোন আছেন, তাদেরকে গিয়ে বিভিন্নভাবে তাদের ওই এনআইডি নম্বর নেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের বিকাশ নম্বর নেওয়ার চেষ্টা করছে। এইভাবে করে তাদেরকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।’
এ জনসভা থেকে দলীয় প্রার্থী যথাক্রমে স্বপন ফকির, আব্দুস সালাম পিন্টু, ওবায়দুর হক নাসির, লুৎফুর রহমান মতিন, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, রবিউল আলম লাবলু, আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী ও আহমেদ আজম খানকে পরিচয় করে দিয়ে তাদের হাতে ধানের শীষ তুলে দেন তারেক রহমান। তাদেরকে বিজয়ী করতে টাঙ্গাইলবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আপনারা যারা মা-বোনরা আজকে এখানে উপস্থিত আছেন, ভাইয়েরা যারা উপস্থিত আছেন- আপনাদের ঘরে এরকম যদি কোনো ঘটনা হয়ে থাকে, সে ব্যাপারে মা-বোনদেরকে সতর্ক করবেন। আপনারা মুরুব্বিদেরকে সতর্ক করবেন যে, যারা ভোটের আগে এইসব অনৈতিক কাজ করতে পারে, তারা যদি সুযোগ পায়- কীভাবে তারা দেশকে বিক্রি করে দেবে এই বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করতে হবে।’
ভোটের দিন সকাল সকাল ভোট কেন্দ্রে যেতে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি বারবার বলছি ভোটের দিন সকালবেলায় ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে আগের দিন থেকেই। যাতে আপনার ভোটে অন্য কেউ আপনার নাম দিয়ে সিল মেরে না আসতে পারে। এই ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কেউ যেন আপনার ভোট চুরি করতে না পারে।’
তিনি বলেন, ‘যার যার এলাকার ভোট কেন্দ্রে আপনাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। যাতে যারা যারা ভোট দিতে চাচ্ছে, যারা যারা ভোটার- অবশ্যই তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু সঠিক লোকটা ভোট দিচ্ছে নাকি অন্য কোনো এলাকা থেকে কেউ এসে তার নাম দিয়ে ভোট দিচ্ছে, এই ব্যাপারে আপনাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। নিজের ভোট কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিতে হবে।’
টাঙ্গাইলের বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের প্রার্থীরা আপনাদের সামনে তাদের নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন দাবি উপস্থাপন করেছেন। ১২ তারিখে আপনারা ধানের শীষকে নির্বাচিত করুন। আপনাদের ভোটে ইনশাল্লাহ ১৩ তারিখে ধানের শীষ তথা বিএনপির সরকার গঠিত হলে, আপনাদের এলাকার যে দাবিগুলো আছে পর্যায়ক্রমিকভাবে সেই উন্নয়নমূলক কাজগুলো আমরা শুরু করব।’
তিনি বলেন, এই টাঙ্গাইল অঞ্চল একটি অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। এই টাঙ্গাইলের শাড়ি আছে। বিভিন্ন রঙের ডিজাইনের শাড়ি আছে। এই শাড়িকে আমরা যদি চেষ্টা করি পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করি— বাংলাদেশের গার্মেন্টসের জামা-কাপড় যেরকম বিদেশে পাওয়া যায়, এই শাড়িকেও আমরা একইভাবে বিদেশে রপ্তানি করতে পারব। এই টাঙ্গাইল থেকে টুপি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যায়। এই যে নামাজ পড়ি, নামাজ পড়ার সময় যে টুপি— এই টাঙ্গাইলে তৈরি হয় এবং এই টুপি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যায়। আমরা যদি উদ্যোগ গ্রহণ করি— এই টুপিতে যারা কাজ করে, আরো বহু সংখ্যক মানুষ এখানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে। অর্থাৎ টাঙ্গাইলকে আমরা পরিকল্পিতভাবে পর্যায়ক্রমে শিল্পের শহরে পরিণত করতে পারব।’
টাঙ্গাইলে যমুনা নদীতে ব্যারেজ নির্মাণ, এই অঞ্চলে মিল কারখানা স্থাপন, আনারসকে প্রক্রিয়াজাত করে জুস তৈরির জন্য কারখানা প্রতিষ্ঠা, পাটশিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে পরিকল্পনার কথাও বলেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সকলে মিলে কাজ করি, সকলে মিলে যদি পরিকল্পনা গ্রহণ করি- ইনশাল্লাহ তাহলে অবশ্যই শুধু টাঙ্গাইল নয়, আমাদের সারা বাংলাদেশে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হব। কিন্তু এই পরিবর্তন যদি আনতে হয়, তাহলে অবশ্যই এই দেশের মালিক যারা, এই জনগণকে আমাদের সাথে থাকতে হবে। কারণ, মালিক ছাড়া তো কোনো কাজ করা যাবে না।
জনগণের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশের মালিক আপনারা যদি বিএনপির পাশে থাকেন, এই দেশের মালিক জনগণ- আপনারা যদি বিএনপিকে সমর্থন দেন, এই দেশের মালিক জনগণ আপনারা যদি বিএনপিকে সামনে এগিয়ে দেন, তাহলে ইনশাল্লাহ বিএনপি ধীরে ধীরে এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে।’
টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি হাসানুজ্জামিল শাহীনের সভাপতিত্বে ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক সাবুর সঞ্চালনায় সমাবেশে বিএনপির সেন্ট্রাল নেতা ও শিল্পপতি সাইয়েদুল আলম বাবুল, বেনজীর আহমেদ টিটু, সাঈদ সোহরাব, শামসুজ্জামান সুরজসহ টাঙ্গাইলের ৮টি আসনের প্রার্থী বক্তব্য রাখেন।
অপরদিকে, দুপুরের পর থেকে বিএনপির নির্বাচনী জনসভা ঘিরে মানুষের ঢল নামে। বিভিন্ন উপজেলার বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মিছিল ও খণ্ড খণ্ড শোভাযাত্রায় সমাবেশস্থল মাঠে জড়ো হয়। মানুষের ভিড়ে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে জনসভা স্থল। জেলায় ১২টি উপজেলা থেকে আসা নেতাকর্মীদের মিছিলে বিভিন্ন স্লোগান, ব্যানার ফেস্টুনে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এমপি প্রার্থীদের বড় বড় মিছিলের বহর মাঠে প্রবেশ করলে নেতাকর্মীদের মাঝে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়। জনসভার মাঠে লাল-সবুজের পতাকা ও বিএনপির দলীয় পতাকা হাতে হাতে ধানের শীষ নিয়ে উজ্জীবিত দেখা যায় নেতাকর্মীদের। বিপুল মানুষের চাপে সমাবেশ স্থলের পাশে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। অনেক তরুণকে প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখার আশায় বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ- সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে দরুন এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল জনস্রোতে।
জন সভায় আসা দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে তারেক রহমানের এ সফর জেলার ৮টি আসনে ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে।
এদিকে নির্বাচনী জনসভাকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাঠ ও আশপাশে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। উত্তরাঞ্চলে প্রচারাভিযানের দুই দিনে তারেক রহমান রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া, রংপুরে চারটি নির্বাচনী সমাবেশ করেন তারেক রহমান। শেষ দিনে সিরাজগঞ্জে ও টাঙ্গাইল নির্বাচনী সমাবেশ শেষে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন তারেক রহমান সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়।
নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র করছে বিশেষ মহল, সতর্ক থাকুন: বিএনপির চেয়ারম্যান


