
আন্তর্জাতিক ডেক্স রিপোর্ট: মার্কিন নৌ-অবরোধও দমাতে পারছে না ইরানের তেল রফতানি! মুখ থুবড়ে পড়ার পথে হোয়াইট হাউসের পরিকল্পনা। তথ্য যাচাইকারী বিভিন্ন সংস্থা জানাচ্ছে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার মুখেও তাদের তেল রফতানির গতি আগের চেয়ে তিনগুণ বাড়িয়েছে ইরান। মার্কিন নৌ-অবরোধের তোয়াক্কা না করেই তরতরিয়ে বাড়ছে ইরানের তেল রফতানি। ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আর সমুদ্রে কড়া নজরদারি যেন এখন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
সমুদ্রপথে তথ্য যাচাইকারী বিভিন্ন সংস্থা জানাচ্ছে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার মুখেও ইরান তাদের তেল রফতানির গতি আগের চেয়ে তিনগুণ বাড়িয়েছে। মূলত অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে বিশাল এক ‘ভুতুড়ে জাহাজ বহর’ বা ঘোস্ট ফ্লিট ব্যবহার করে চীনসহ বিভিন্ন দেশে তেল পৌঁছে দিচ্ছে তেহরান।
ইরানের বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি এবং সাগরপথে জাহাজের আনাগোনা নজরদারি করে এমন তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা বা ডাটা ট্র্যাকিং সাইটগুলোর অন্যতম ড্রপসাইট-এর বরাতে জানা গেছে, গত মার্চ মাসের শেষ নাগাদ ইরানের প্রায় ১৭ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় ছিল। এর মধ্যে ১৫ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেলই হলো অপরিশোধিত জ্বালানি তেল।
সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষক সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড দাবি করেছে, মার্কিন নৌবাহিনীর শক্ত অবস্থান সত্ত্বেও এই বিশাল পরিমাণ তেলের চালান আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব।
তাদের তথ্যমতে, ইরানের তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই যাচ্ছে চীনের বাজারে। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানো হচ্ছে এমন সব ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে, যেগুলো নিজেদের রেডিও এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে রাখে। বর্তমানে এমন ১২৯টি ট্যাঙ্কার শনাক্ত করা হয়েছে যেগুলো কোনো ধরনের সিগন্যাল ছাড়াই সমুদ্র চষে বেড়াচ্ছে।
ইরানের পারমাণবিক এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর নজরদারির কাজে নিয়োজিত মার্কিন শক্তিশালী তদারকি সংস্থা ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান বা ইউএএনআই স্যাটেলাইট ছবির সূত্র ধরে জানিয়েছে, গত ৬ এপ্রিল ইরানের চাবাহার বন্দরের কাছে অন্তত ১৫টি ইরানি পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার দেখা গেছে। এছাড়া মালয়েশিয়ার জোহোর উপকূলের কাছে প্রায় ৯৬টি ট্যাঙ্কার নোঙর করে আছে, যেগুলোকে মূলত ‘ঘোস্ট ফ্লিট’ বা ভুতুড়ে বহর বলা হয়। সেখানে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল সরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত গোপনে সেগুলো চীনের বন্দরে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে মালাক্কা প্রণালী এবং দক্ষিণ চীন সাগরেও। অন্যদিকে ওমান সাগরেও ইরানের প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল মজুদ রয়েছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নানামুখী চাপ আর অবরোধের মুখেও ইরান তাদের তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রফতানি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সব ধরনের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে সোমবার ১৩ এপ্রিল সকালে হরমুজ প্রণালী এবং ইরানি বন্দরগুলোতে সামরিক অবরোধ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব রুখতে তাদের তেল বিক্রির সক্ষমতা পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেওয়া।
-
প্রেক্ষাপট ও প্রভাব নিচে তুলে ধরা হলো:
- অবরোধের কারণ: পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ না করার অনড় অবস্থানের কারণে আলোচনা ভেঙে যায়।
- সামরিক তৎপরতা: ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, তাদের বাহিনী হরমুজ প্রণালীসহ আরব সাগর ও ওমান উপসাগরে ইরানের বন্দরগুলোতে আসা-যাওয়া করা সব দেশের জাহাজের ওপর এই অবরোধ কার্যকর করবে। তবে অন্য কোনো দেশের বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজ এতে প্রভাবিত হবে না।
- বাজারের অস্থিরতা: এই ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১০১.৮৬ ডলারে পৌঁছেছে এবং ইউএস ক্রুড ফিউচার প্রায় ৮% বেড়ে ১০৪.২০ ডলার হয়েছে।
- ইরানের ওপর প্রভাব: ইরান তার তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই চীনের কাছে বিক্রি করে। এই অবরোধ কার্যকর হলে তেহরানের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তেল রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
- বিশ্ব অর্থনীতিতে ঝুঁকি: বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়। এই সরবরাহ পথ বন্ধ হওয়াকে ১৯৭০-এর দশকের সংকটের পর বৃহত্তম জ্বালানি বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।


