বাড়িচিরন্তন- ১৯৭১বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য

বিশেষ প্রতিবেদন (সংগৃহীত): ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ আর সৃষ্টিশীলতাকে লালন করার প্রত্যয়ে ইউনেস্কো ঘোষিত সংস্কৃতি বিষয়ক বিভিন্ন কনভেনশনের আলোকে বিএনসিইউ’র সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। বিএনসিইউ’র সক্রিয় সহযোগিতায় পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ ও মসজিদের শহর বাগেরহাট ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য এবং সুন্দরবন প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বাউল সঙ্গীত এবং ঐতিহ্যবাহী জামদানী বুনন ইতোমধ্যে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ শে ফেব্রুয়ারীর স্বীকৃতি অর্জনেও বিএনসিইউ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়াও, বাংলাদেশের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ, তুলে ধরা এবং টেকসই উন্নয়নের বাহন হিসেবে সংস্কৃতির ভূমিকাকে আরো গতিশীল করতে বিএনসিইউ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ উদ্যোগে সভা, সেমিনার, কর্মশালা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো নানামুখী কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে।

  • বাউল সংগীত:

বাউল সংগীত বা বাউল গান হলো আধ্যাত্ববাদের চেতনাপুষ্ট লোক সংগীতের এক বিশেষ ধারা যা হিন্দু শাস্ত্রের ভক্তিবাদ ও একই সাথে সুফি সংগীত দ্বারা প্রভাবিত। সে অর্থে বাউল সংগীত একটি ভিন্নমার্গী আধ্যাত্বিক দর্শনের নামান্তর যা গুরু থেকে শিষ্যে মুখে মুখে যুগ যুগ ধরে সঞ্চারিত হয়েছে। স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্কের ভাবনা আর ভিন্নধর্মী জীবন দর্শনের মধ্যেই বাউলদের বিশেষত্ব নিহিত রয়েছে। তাদের দর্শন কোনো বিশেষ ধর্ম, জাত, বর্ণ বা দেবতার বিশ্বাসের গন্ডীতে সীমাবদ্ধ নয় বরং শ্রষ্টাকে তারা আত্বার অংশ হিসেবে বিশ্বাস করে। এই দর্শনেই তাদের আত্মার মুক্তি।
বাউলরা মূলত গ্রামীন জনপদে বসবাসকারী চারণ কবি। এদের কেউ কেউ নির্দিস্ট স্থানে স্থায়ী আবার অনেকে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পরিযায়ী। এই গানের ভাষা, কথা, সুর সবই তারা নিজেরা আরোপ করে থাকে। বাউল গানের জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বাংলাদেশের আধুনিক সংগীতেও প্রভাব বিস্তার করেছে।
মানবতার ইতিহাসে এই বাউল সংগীতের অপরিসীম সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় ইউনেস্কো ২০০৫ সালে একে “Masterpiece of the Oral and Intangible Heritage of Humanity” হিসেবে ঘোষনা দেয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ইউনেস্কোর অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত Intergovernmental Committee’র তৃতীয় অধিবেশনে বাংলাদেশের বাউল সংগীতকে Intangible Cultural Heritage of Humanity হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

  • ঐতিহ্যবাহী জামদানী বুনন:

জামদানি হস্তচালিত তাঁতে সুতায় বোনা এক বিশেষ নকশার কাপড় যা অতীতে মসলিন নামে প্রচলিত ছিল। এটি বাংলাদেশের বুননশিল্পের সর্বাপেক্ষা শৈল্পিক নিদর্শন যা অন্যতম সময় সাপেক্ষ ও শ্রমঘন কুটির শিল্প। বাংলার বা বাংলাদেশের রয়েছে জামদানি বুননের নিজস্ব ইতিহাস। ঢাকা ও এর আসে-পাশের অঞ্চলগুলোতে প্রথাগত তাঁতে দৃস্টিনন্দন নকশায় জামদানি তৈরি হয়। বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত জামদানি বুননের এই শৈল্পিক জ্ঞান ও দক্ষতা এই শিল্পকে একটি পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ, একজন জামদানি কারিগরের শৈল্পিক অনুভব আর বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জামদানি বুনন শিল্পী ছাড়াও সুতা তৈরি ও রং করার কারিগর, তাঁত প্রস্তুতকারী ও সংশ্লিষ্ট কারিগর সকলে মিলে একটি বিশেষ সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে যা বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক হিসেবে বিশ্ব দরবারে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছে।
বংলাদেশের সাংস্কৃতিতে জামদানির অপরিসীম ঐতিহ্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় ইউনেস্কো ২০১৩ সালে অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত Intergovernmental Committee’র অষ্টম অধিবেশনে ঐতিহ্যবাহী জামদানি বুনন্ শিল্পকে Intangible Cultural Heritage of Humanity হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।

  • পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভযাত্রা:

প্রতি বছর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে মঙ্গলের আহ্বান আর শুচিতার কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে একটি বর্নাঢ্য শোভাযাত্রা আয়োজন করা হয় যা মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে পরিচিত। মূলতঃ চারুকলা অনুষদের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্যোগে ও ব্যবস্থাপনায় এই আয়োজন করা হলেও শহরের সকল স্তরের মানুষ এই আনন্দযাত্রায় স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ করে থাকেন। আশির দশকে বন্যা ও সামরিক শাসনের নাগপাশে বিপর্যস্থ জনপদে সৃষ্টিশীল ও গণমুখী প্রতিবাদ গড়ে তোলার মানসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালের পহেলা বৈশাখ মঙ্গল শোভাযাত্রা (wellbeing procession) আয়োজন করা হয়। এর পর থেকে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে বিগত বছরের সকল অমঙ্গল আর গ্লানিকে পিছনে ফেলে আগত বছরের সাফল্য কামনায় বিপুল উৎসাহ আর উদ্দীপনায় এটি উদযাপিত হয়ে আসছে।
বাঙালি ঐতিহ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রার অপরিসীম প্রভাবের স্বীকৃতি হিসেবে ইউনেস্কো ২০১৬ সালে অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত Intergovernmental Committee’র এগারোতম অধিবেশনে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাজাত্রা-কে Intangible Cultural Heritage of Humanity হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।

  • সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি বুনন:

শীতল পাটি হলো ঐতিহ্যবাহী হাতে তৈরি মাদুর যা মুরতা নামের এক বিশেষ ধরণের বেত গাছের চিকন ফালি দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে। সাধারণত আসন, বিছানার আবরণ বা নামাজের পাটি হিসেবে বাংলাদেশ সকল জায়গায় শীতল পাটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র আকারে ছড়িয়ে চিটিয়ে থাকলেও এই শিল্পের সাথে জড়িত বৃহৎ জনগোষ্ঠী মূলতঃ বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট জেলার নিন্মাঞ্চলে বসবাস করে। নারী -পুরুষ উভয়েই বেত সংগ্রহ ও এর প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে জড়িত থাকলেও মূলতঃ নারীরাই এর বুননের সঙ্গে বেশী জড়িত থাকে। পারিবারিক বা কুটির শিল্প হিসেবে এটি পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি একটি বিশেষ শিল্পের ধারক ও বাহক হিসেবে একটি জনগোষ্ঠীর শিল্পীসত্ত্বার পরিচিতি নির্ধারণেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। সিলেটের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি তথা প্রধান বুননশিল্পী হিসেবে নারীর সামাজিক ও শৈল্পিক গুরুত্ব নির্ধারণে এটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের শীতলপাটি বুনন শিল্পের ঐতিহ্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় ইউনেস্কোর ২০১৭ সালে অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত Intergovernmental Committee’র বারোতম অধিবেশনে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি বুননশিল্পকে Intangible Cultural Heritage হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

  • সুন্দরবন:

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে পৃথিবীর একক বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এর অবস্থান। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এ বন প্রায় ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট যার ৬০ শতাংশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত ও বাকী অংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন প্রায় ৬,০১,৭০০ হেক্টর যা দেশের মোট আয়তনের ৪.১৩%।
সুন্দরবনের ৩ টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য নিয়ে গঠিত ১,৩৯,৭০০ হেক্টর বনাঞ্চলকে ১৯৯৭ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ২১তম অধিবেশনে ইউনেস্কো ওয়ার্লড ন্যাচারাল হেরিটেজ বা বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতে অবস্থিত সুন্দরবন ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে।
সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ অঞ্চল যা প্রকৃতি ও জীববৈচিত্রের এক অনন্য আধার। বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও বৈচিত্রপূর্ণ প্রাণিকূল ও বৃক্ষরাজী সংলগ্ন অঞ্চল তথা বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চলমান পরিবেশগত প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

  • পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ:

ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত প্রাচীন বরেন্দ্র ভূমি সংলগ্ন নঁওগা জেলায় অবস্থিত বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ এর অবস্থান। এটি বাংলাদেশের প্রাক-ইসলাম যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও নান্দনিক স্থাপনা। সোমপুর বিহার বা মহাবিহার নামে সুপরিচিত এই বৌদ্ধ ধ্বংশাবশেষ সপ্তম শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম প্রসার ও জ্ঞানচর্চার প্রসিদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল। বিহার এর ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকৃত নিদর্শন অনুযায়ী বরেন্দ্রি-মগধ রাজা ধর্মপাল বিক্রমশীলা (৭৭০-৮১০ খ্রিষ্টাব্দ) এর প্রথম নির্মান শুরু করেন। বৌদ্ধ ধর্মের চরম উৎকর্ষতার যুগে পরবর্তী বৌদ্ধ রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে এই পাহাড়পুর বিহার ও মন্দির গড়ে ওঠে। ধ্বংসস্তুপে পরিনত হলেও ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক কারণে এই মহাবিহারটি আজও এশিয়ার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ বিহার বলে সগৌরবে দন্ডায়মান।
মোট ৭০.৩১ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য ১৭৭ টি কক্ষ ছিল। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৩৪ খ্রি: পর্যন্ত খননের মাধ্যমে এই বিহারের পূর্ব দিকে সত্যপিরের ভিটা ও মন্দিরের চর্তুদিক বেষ্টীত কক্ষগুলো ও সমগ্র প্রত্নাবশেষটি আবিস্কার করে। এর মধ্যভাগে প্রধান বিহার এবং তাকে ঘিরে ১৯৮টি বাসপযোগি কক্ষ, বিস্তৃত প্রবেশ পথ, অসংখ্য বিনোদনস্তুপ, ছোট ছোট মন্দির, পুষ্করিণী অবস্থিত। মন্দিরটি উত্তর-দক্ষিণে দৈঘ্য ৩৫৭ ফুট প্রস্থে পূর্ব-পশ্চিমে ৩১৪ ফুট। মূল বিহারটি এর মধ্যস্থলে অবস্থিত। বিহারের গায়ে খোদাইকৃত নকশা ও এর বৌদ্ধ স্থাপত্যশৈলী্র প্রভাব সুদূর কম্বোডিয়া পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করেছিল।
১৯৮৫ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৯ম অধিবেশনে নঁওগা জেলার পাহাড়পুরে অবস্থিত বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ কে ইউনেস্কোর ওয়ার্লড কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

  • বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদের শহর:

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বাগেরহাট জেলার শহরতলীতে ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বা (Historic Mosque City of Bagerhat) এর অবস্থান। ভৈরব নদের দক্ষিণ তীর শেষে গড়ে ওঠা এই শহরের প্রাচীন নাম ছিল খলিফাতাবাদ। তুর্কির সামরিক প্রধান উলুঘ খান জাহান ১৫ শতকে প্রায় ৫০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট এ প্রাচীন শহর এর গোড়াপত্তন করেন। পোড়ামাটির ইট দিয়ে তৈরি এখানে অবস্থিত ৩৬০টি মসজিদ ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, মাজার, পানির ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ তৎকালীন সময়ের কারিগরী দক্ষতা ও বাংলায় মুসলিম স্থাপত্যের সমৃদ্ধির প্রাথমিক সময়কালে নির্মিত স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন বহন করে। এখানে অবস্থিত অন্যতম বড় স্থাপনা হলো ষাটগম্বুজ মসজিদ যা তৎকালীন বাংলায় নির্মিত গতানুগতিক মসজিদের নকশার অন্যতম নিদির্শন। এ শহরের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হল ধর্মসাধক খান জাহান আলীর মাজার যা এক বিশেষ ধরণের স্থাপত্যশৈলী (খান-এ-জাহান) ও আরবী হরফে লেখনীশৈলীর এক অনন্য উদাহরণ।
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ শহরের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যশৈলীর গুরুত্ব বিবেচনায় ইউনেস্কো ১৯৮৫ সালে একে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা World Cultural Heritage হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৯ম অধিবেশনে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

  • ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ:

‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’ ও ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ অন্তর্ভুক্তির পটভূমি। ইউনেস্কোর পরিভাষায় ডকুমেন্টারি হেরিটেজ হলো সেই সব নথি বা প্রামাণ্য দলিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যার ঐতিহ্যগত গুরুত্ব রয়েছে। আর এ সব প্রামান্য দলিলের তালিকা হলো ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’। সংরক্ষণের পাশাপাশি বিশ্ববাসীকে এসকল প্রামাণ্য ঐতিহ্য সম্পর্কে পরিচিত করে তোলার লক্ষ্যে ১৯৯২ সালে ইউনেস্কো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড কর্মসূচি শুরু করে। এই তালিকায় স্থান পেতে পর্যাপ্ত গ্রহণযোগ্যতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকতে হবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার-এ বাংলাদেশ থেকে অন্তর্ভুক্ত একমাত্র প্রামান্য দলিল যা বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন সর্বপ্রথম ২০০৯ সালের ১২ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইন্ট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব ইউনেস্কোতে প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ লক্ষ্যে বিএনসিইউ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত সারসংক্ষেপ ২৩ মার্চ ২০০৯ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করা হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ মার্চ ২০০৯ তারিখে তা অনুমোদন করেন। পরবর্তীতে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার-এ অন্তর্ভুক্তির জন্য অধিকতর উপযোগী বলে প্রতীয়মান হয়। এরপর ২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারি কোরিয়ান ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠেয় মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড বিষয়ক কর্মশালায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানায়। বিএনসিইউ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের উপর প্রস্তুতকৃত খসড়া প্রস্তাব উক্ত কর্মশালায় প্রেরণ করে। ২০১৩ সালে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন-এ অনুষ্ঠিত হয় পরবর্তী কর্মশালা। এ ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ৪-১৫ এপ্রিল তারিখে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর নির্বাহী বোর্ডের ১৯৯তম সভাকালীন বিএনসিইউ পরিমার্জিত প্রস্তাবটি ইউনেস্কোতে দাখিলের উদ্দেশ্যে প্যারিসস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেরণ করে।
৩০ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে ইউনেস্কো মহাপরিচালক মিজ ইরিনা বোকোভা মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার সংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর করলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার-এ অন্তর্ভুক্ত হয়।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Recent Comments