বি এম শফিকুল ইসলাম টিটু, সিনিয়র চীফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া (ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা) এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়- এই চার ক্যাম্পাসে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, যাতে উভয় পক্ষের অন্তত সাত ডজনের বেশি নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থী আহত হন। মঙ্গলবার ৪ আগস্ট রাজধানীর তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং অপরদিকে সোমবার ৩ আগস্ট বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত এসব ঘটনায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন শিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের ওপর ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার বিকেল পৌনে ৫টার দিকে কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের একটি মিছিল হাসপাতালের সামনে গেলে এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ঃ
সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে প্রথমে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশ করতে গেলে ছাত্রদলের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে সেমিনার শেষে শহীদ মিনারের সামনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনায় জকসু ও ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়ে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। অন্যদিকে ছাত্রদলও তাদের কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হওয়ার দাবি করেছে।
জকসুর ভিপি ও ছাত্রশিবির নেতা রিয়াজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, প্রক্টোরিয়াল টিম শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে শিক্ষার্থী ও জকসুর সদস্যদের মারধর করেন। তাকে টেনেহিঁচড়ে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহিন মিয়া অভিযোগ করেন, সেমিনার শেষে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জকসুর ভিপি, জিএস, এজিএস এবং ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখসহ কয়েকজনকে মারধর করেন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ইউজিসির চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এতে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীও আহত হয়েছেন।
ঢাকা কলেজঃ
মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে মিছিল করেন।
ছাত্রশিবিরের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গ্যালারি-২-এ শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালান। এতে কয়েকজন আহত হন। আহতদের মধ্যে শাখা অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেক মাথায় আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
অন্যদিকে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের দাবি, শিবিরের বহিরাগত নেতাকর্মীরা সকালে ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে উসকানিমূলক আচরণ করেন এবং ছাত্রদলের এক কর্মীকে মারধর করার পর সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাদ হোসেন বলেন, শিবির পরিকল্পিতভাবে হামলার চেষ্টা করেছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই তারা অবস্থান নিয়েছেন। ঘটনার পর কলেজ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাঃ
বিকেলে রাজধানীর বকশীবাজারে অবস্থিত ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে এবং উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। আহত দুই ছাত্রদল নেতা হলেন মাদ্রাসার সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ (৩০) এবং লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিছার উদ্দিন রাব্বি (২৭)। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
আহতদের দাবি, তারা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নন; বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে শিবিরের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের লাঠিসোঁটা দিয়ে মারধর এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
সংঘর্ষের কারণ ও উভয় পক্ষের অবস্থানঃ
-
-
ছাত্রদলের বক্তব্য: তাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মীসভা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে বাধা দেওয়া, শিবিরের আধিপত্য বিস্তার এবং ক্যাম্পাসের পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টার প্রতিবাদে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
-
ছাত্রশিবিরের বক্তব্য: জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণমূলক প্রোগ্রাম ও ব্যানারে হামলা, আবাসন সংকট ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি উপস্থাপন কর্মসূচিতে ছাত্রদল অতর্কিত হামলা চালিয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেছে।
-


