বাড়ি আইন ও আদালত ত্রয়োদশ সংসদে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ বহাল সহ ৯১টি বিল পাস

ত্রয়োদশ সংসদে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ বহাল সহ ৯১টি বিল পাস

0
18
"ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে 'সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬' পাস করার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ বহাল"

বি এম শফিকুল ইসলাম টিটু, সিনিয়র চীফ রিপোর্টার: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের বৈধতা দেওয়ার কাজ শেষ করেছে জাতীয় সংসদ। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সহ ১১৩টি অধ্যাদেশকে ৮৭টি বিল পাসের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চারটি পৃথক বিল পাসের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ ৭টি অধ্যাদেশকে বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া গণভোট অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশসহ ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকারের জারি করা বাকি ১৩টি অধ্যাদেশে সংসদের অনুমোদন মেলেনি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যদেশের মধ্যে ২০টি কার্যকরিতা হারালো।
শুক্রবারসহ টানা ছয় দিনে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে ১২০টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি হয়। দেশের জাতীয় সংসদের ইতিহাসে এত অল্প সময়ের মধ্যে এত সংখ্যক বিল পাসের নজির নেই। আজ শেষ দিনে ২৪টি বিল পাস হয়। এছাড়া ৫ এপ্রিল ২টি, ৬ এপ্রিল ৭টি, ৭ এপ্রিল ১৪টি, ৮ এপ্রিল ১৩টি ও ৯ এপ্রিল ৩১টি বিল পাস হয়।
রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ ৭টি অধ্যাদেশে গৃহীত কার্যক্রমের সুরক্ষা দেওয়া হলেও গণভোট, দুদক এবং গুমসহ ১৩টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে কোনো সুরাহা আসেনি। ফলে এসব অধ্যদেশের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের সুরক্ষা কী হবে তা অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। এমনটি গণভোট অধ্যাদেশের অধীনে অনুষ্ঠিত ‘গণভোট ২০২৬’সহ অন্যান্য কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হলো।
সংসদ না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি যেসব অধ্যাদেশ জারি করেন তা সংসদের বৈঠকে উত্থাপনের এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শুক্রবার ছিল সংসদে নিষ্পত্তির শেষ সময়। ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশনের শুরুর দিনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে এ ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করেন। পরে অধ্যাদেশগুলো যাছাই-বাছাইয়ের জন্য সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়। ২ এপ্রিল বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন সংসদে প্রতিবেদন পেশ করেন। ওই প্রতিবেদনে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু ও ১৫টি সংশোধিত আকারে পাস করার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া ৪টি বাতিল ও ১৬টি পরবর্তীতে যাচাই-বাছাইসহ অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়। বিশেষ কমিটির সুপারিশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ভবিষ্যতে নতুন বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ থাকলেও সুপারিশের বাইরে গিয়ে সংসদে বিল তুলে অধ্যাদেশটি রহিত করে আগের মানবাধিকার কমিশন আইনকে পুনর্বহাল করা হয়েছে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে নতুন আইনগত পদক্ষেপ। সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে, যার ফলে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই বহাল থাকছে। বুধবার বেলা সোয়া ১২টার দিকে জাতীয় সংসদে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর মধ্য দিয়ে পূর্বে জারি করা আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আইনগত ভিত্তি পেল। এর আগে ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সেই সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের ভিত্তিতে কার্যকর ছিল। পরবর্তীতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি পর্যালোচনা করে সংশোধিত আকারে সংসদে আইন হিসেবে পাসের সুপারিশ করে। কমিটির সুপারিশের আলোকে সংশোধিত আকারেই বিলটি সংসদে উত্থাপন ও পাস করা হয়। অপরদিকে কমিটির প্রতিবেদনে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশকে সংশোধিত আকারে বিল পাসের সুপারিশ হলেও এই অধ্যাদেশটি তোলাই হয়নি। এদিকে বিশেষ কমিটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ হুবহু পাসের সুপারিশ হলেও শেষ দিনে তোলা এ সংক্রান্ত বিলটি সংশোধিত আকারে পাস হয়। বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিলটি সংশোধন হওয়ার কারণে বিরোধী দল এর তীব্র প্রতিবাদ করে। বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সমঝোতা ভঙ্গের অভিযোগ তুলে বলেন, আপনার সামনে (স্পিকারের) দিনে দুপুরে ছলচাতুরি ও জোচ্চুরির মাধ্যমে সংসদে পাস করা হয়েছে। এ বক্তব্যের জের ধরে উভয়পক্ষের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বাহাস হয়। এ সময়ে সমঝোতা ভঙ্গের বিষয়টি স্বীকার করেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। তবে তিনি দাবি করেন, বেসরকারি সদস্যের সংশোধনী প্রস্তাবের ফলে এই সংশোধনীটি গ্রহণ করা হয়েছে। দুই পক্ষের আলোচনার এক পর্যায়ে সরকারের বিরুদ্ধে বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ তুলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন। এর আগে তারা স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এদিকে সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে যেসব অধ্যাদেশ রহিতকরণ করা হয়েছে সেগুলো হলো- সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত, জাতীয় সংসদ সচিবালয় সংক্রান্ত এবং মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত। সংসদে উত্থাপন হলেও আইনী সুরক্ষা না দেওয়ার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের যে ১৩টি অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে কার্যকারিতা হারাচ্ছে সেগুলো হলো- গণভোট অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত ২টি অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ এবং রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ। শুক্রবার শেষ দিনে ২৮টি বিল পাস হয়েছে। এগুলো হলো- গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের উত্থাপিত নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল; বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল; ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল; কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল এবং রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর উত্থাপিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী (সংশোধন) বিল ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর উত্থাপিত বাংলাদেশ বনশিল্প কর্পোরেশন বিল এবং বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) বিল।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উত্থাপিত আমানত সুরক্ষা বিল; দ্যা এক্সসাইজ এন্ড সল্ট (সংশোধন) বিল; মুল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল; গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) বিল; বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল; ব্যাংক রেজুলেশন বিল এবং অর্থ (২০২৫-২৫) অর্থ বৎসর বিল।
শিক্ষমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের উত্থাপিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সির্টি বিল; বিশ্বদ্যালয় সংক্রান্ত কতিপয় আইন (সংশোধন) বিল; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম উত্থাপিত জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বিল এবং সাইবার সুরক্ষা বিল; প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উত্থাপিত মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের উত্থাপিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল; সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন উত্থাপিত ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংরক্ষণ) বিল; মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান উত্থাপিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল পাস হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস করার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ বহাল রাখা হয়েছে। নতুন এই আইনের আওতায় এখন থেকে সরকার কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা রাজনৈতিক দলকে সন্ত্রাসে জড়িত থাকার অভিযোগে নিষিদ্ধ করতে পারবে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের কার্যক্রম অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন বা দলকে অর্থ, আশ্রয় বা অন্য কোনো সহায়তা প্রদান করলে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান আগের তুলনায় আরও কঠোর করা হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ১১ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনের জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করে, যা পরবর্তীতে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
ওই সময় সংসদ কার্যকর না থাকায় সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এই অধ্যাদেশ জারি করেন। সংশোধিত আইনটি পাস হওয়ায় এখন এটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামোর অংশ হিসেবে কার্যকর হবে। এছাড়া, এ বিশেষ অধিবেশনে জরুরি বিভিন্ন আইনসহ মোট ৯১টি বিল পাস করা হয়েছে, যা জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ। 
  • নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত মূল তথ্যাবলি:
  1. আইন পাস: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপনের পর কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।
  2. নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি: ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিশেষ অধ্যাদেশ, যার মাধ্যমে দলটির সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনগুলোর কার্যক্রমও নিষিদ্ধ থাকে।
  3. কার্যকারিতা: ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
  4. পাস করা অন্যান্য বিল: ৯১টি বিলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- জুলাই অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) বিল, ২০২৬, সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল এবং ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল।
এই আইন পাসের ফলে আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, মিছিল, সমাবেশ বা গণমাধ্যমে বক্তব্য প্রচার নিষিদ্ধ থাকছে।

অতঃপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বুধবার ১৫ এপ্রিল বেলা ১১টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছে। শুক্রবার জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) এ মুলতবি ঘোষণা করেন।

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে