
বি এম শফিকুল ইসলাম টিটু, সিনিয়র চীফ রিপোর্টার: জলবায়ু সংকট বর্তমান বিশ্বের অন্যতম একটি বড় সমস্যা এবং দিন দিন এর প্রভাব পৃথিবীর ওপর উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি নেতৃস্থানীয় মার্কিন জলবায়ু বিজ্ঞানীদের এক প্রতিবেদন বলেছে যে, ২০২১ সাল ছিল বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের জন্য সর্বোচ্চ উষ্ণতার বছর। জলবায়ু পরিবর্তন জীবিকা, অবকাঠামো এবং আবাসন ধ্বংস করছে, মানুষকে তাদের বাড়ি, শহর এমনকি দেশ থেকে বাধ্য করছে। শুধু ২০১৬ সালে চরম আবহাওয়া বিপর্যয়ে সারাবিশ্বে প্রায় ২৩.৫ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আর এসব ক্ষতিকর প্রভাবের প্রথম সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সমতল এবং নীচু ভূমি, জনসংখ্যার ঘনত্ব, দারিদ্র্যের উচ্চ হার, জলবায়ু সংবেদনশীল খাত, বিশেষ করে কৃষি ও মৎস্যসম্পদে অনেক জীবিকার নির্ভরতা এবং অদক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কারণে ঝুকিরমাত্রা অনেকাংশে বেড়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাব যেমন সমুদ্রপৃষ্ঠের উ”চতা বৃদ্ধি, উচ্চ তাপমাত্রা বর্ধিত মৌসুমী বৃষ্টিপাত এবং ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি, বিদ্যমান সমস্যাগুলিকে আরও বাড়িয়ে তুলবে যা ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। এছাড়াও বিপুল সংখ্যক জনসংখার দেশে প্রতিকূল পরিবেশ পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা হ্রাস করে । এসব প্রভাব দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, জাতীয় উন্নয়ন এবং জনগণের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এসব বিপর্যয় জাতিকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়াও কৃষির উপর নির্ভরশীল অর্থনীতি, প্রতিকূল আবহাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে বিপন্ন করে তুলছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের তাপমাত্রা প্রায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। ২০৪০ -২০৫৯ সালের মধ্যে, বার্ষিক বৃষ্টিপাতও ৭৪ মিলিমিটার বৃদ্ধি হতে পারে জলবায়ূবিদরা আশংকা করছেন। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার সাথে সাথে আরও বেশি লোক তাদের বাড়িঘর এবং জমি থেকে বিতাড়িত হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উ”চতা বৃদ্ধি, ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, খরা, ভাঙন, ভূমিধস এবং বন্যা ইতোমধ্যেই বিপুল সংখ্যক মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে।
আমাদের অর্থনীতি প্রধানত কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের জন্য আমাদের ছিলো যথাযোগ্য তাপমাত্রা, ছয়টি আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ঋতু কিন্তু দিনে দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ষড়ঋতু হারিয়ে যেতে বসেছে এবং তার সাথে সাথে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা সবকিছুতে আমূল পরিবর্তন আসছে। ফলে অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, সেচের পানির অপর্যাপ্ততা, উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষা মৌসুম ছাড়াও বিভিন্ন সময় উপকূলীয় বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উ”চতা বৃদ্ধিতে লবণাক্ত পানিতে জমি ডুবে যাওয়ার মতো নানাবিধ সমস্যায় বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ চরম হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ নির্ভর উপজীবীরা তাদের জীবিকা হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়বে। এতে দেশে বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৪ হাজার বর্গকিলোমিটার ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা আকস্মিক বন্যার শিকার। মৌসুমি বন্যা উপকূলীয় এলাকায় সমস্যার সৃষ্টি করে না। কিন্তু বন্যাপ্রবণ এলাকায় এর প্রভাব খুব বেশি। এটি ফসল ছাড়াও জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করে। জোয়ারজনিত বন্যা উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি করে। জমিতে লবণাক্ত পানির জলাদ্ধতার সৃষ্টি করে, যা ফসল চাষের জন্য অনুপযোগী। বাংলাদেশ পানিসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি, বন্যা ও জলাবদ্ধতার প্রকোপ ক্রমাগত বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ১.৫ মিলিয়ন হেক্টর জমি প্রতি বছর বন্যাকবলিত হয়। বাংলাদেশের গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৩০০ মি.মি এবং অঞ্চল ভেদে তা ১২০০ মি.মি (দক্ষিণ-পশ্চিম) থেকে ৫০০০ মিলিমিটার (উত্তর-পূর্বাঞ্চল) পর্যন্ত হয়ে থাকে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ছে এবং ২০৩০ সনে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১০-১৫ শতাংশ এবং ২০৭৫ সনে প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম একটি হলো বাসস্থানের নিশ্চয়তা। পরির্তিত জলবায়ু পরিস্থিতি মানুষের বাসস্থানকে দিন দিন বিপর্যস্ত করে তোলছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২৮ ভাগ উপকূলে বাস করে যেখানে বাসÍুচ্যুতির প্রাথমিক কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠের উ”চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস। বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ মিটারের কম। অনুমান করা হচ্ছে যে, ২০৫০সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতি সাতজনের একজন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হবে। শুধুমাত্র সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ১৮ মিলিয়ন লোককে নিজ আবাস ছাড়তে হতে পারে। ২০৫০ সাল নাগাদ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উ”চতা ৫০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধির সাথে সাথে, বাংলাদেশ তার ভূমির প্রায় ১১% হারাতে পারে, যা এর নিচু উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী আনুমানিক ১৫ মিলিয়ন মানুষকে প্রভাবিত করবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উ”চতা বৃদ্ধির ফলে আবাদি জমি লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং উপকূলীয় পানীয় জলের সরবরাহ লবণ দ্বারা দূষিত হচ্ছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের জীবিকা ও তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ এবং চর্মরোগের মতো স্বাস্থ্যঝুকি বেড়েই চলছে।
জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে নদীভাঙনের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহুরে বস্তিতে বসবাসরত মানুষের মধ্যে ৫০ ভাগই নদীভাঙনের শিকার ফলে তারা তাদের গ্রামীণ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঝড়ের ক্রমবর্ধমান তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে যা মানুষের জীবনহানিসহ ঘরবাড়ি, সম্পত্তি ও অবকাঠামোর ক্ষতি এবং কৃষি ও অন্যান্য জীবিকাকে ব্যাহত করে। এছাড়াও প্রতিদিন ১০০০-২০০০ লোক বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমায়। ২০১২ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যায় যে, শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ১৫০০টি পরিবার অভিবাসনের জন্য পরিবর্তিত পরিবেশকে প্রধান কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছে।


