মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান রুমন, ঢাকা রিপোর্টার: রাজধানী ঢাকায় আকশ্মিক বেড়েছে নাশকতার আশঙ্কা। শুক্রবার দুপুর থেকে শনিবার রাত পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন এবং জব্দ করা যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে রাজধানীর বাইরে মানিকগঞ্জেও ঘটেছে ককটেল বিস্ফোরণ। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় নগরজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাজধানীর মিরপুর, পোস্তগোলা, যাত্রাবাড়ী ও রামপুরাসহ বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ এবং যাত্রীবাহী বাসসহ একাধিক যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, প্রবেশপথ, উড়ালসড়ক, জনবহুল এলাকা ও কেপিআই এলাকায় বসানো হয়েছে দুই শতাধিক চেকপোস্ট। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে চলছে বিশেষ তল্লাশি। বাড়ানো হয়েছে পুলিশি টহল, মোটরসাইকেল পেট্রোলিং ও গোয়েন্দা নজরদারি। রাজধানীতে প্রবেশের চারটি পথেও বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। এর মধ্যেই গত ২৪ ঘণ্টায় ডিএমপির বিভিন্ন অভিযানে ৫১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৪৭টি মামলা হয়েছে। তবে শুক্রবার ও শনিবারের ককটেল বিস্ফোরণ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া এখনো চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের খবর আসতে থাকে। মালিবাগের সোহাগ বাস কাউন্টারের সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ দিয়ে শুরু হয় ধারাবাহিকতা। এরপর আগারগাঁওয়ের বেতার ভবনের সামনে, মহাখালী, বাবুবাজার ব্রিজের নিচে ও মগবাজার মোড়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যাত্রাবাড়ীতে। থানার প্রধান ফটকের সামনে একটি ককটেল বিস্ফোরণের পর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে আরও তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ইবাদুর রহমান নামে এক অটোরিকশাচালক আহত হন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রামপুরা বিটিভি ভবনের সামনে দুটি এবং নিউমার্কেটের ঢাকা কলেজের সামনে আরও একটি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। পুলিশ এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করছে। বিভিন্ন থানায় জিডি ও মামলা হয়েছে।
ককটেল বিস্ফোরণের এক দিন পর শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়ায় বাসে আগুনের ঘটনায়। সন্ধ্যা ৭টা ১৩ মিনিটে মিরপুর-১১ নম্বরের জমজম টাওয়ারের সামনে শিকড় পরিবহনের একটি চলন্ত বাসে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস।
প্রায় একই সময়ে মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় অভিজাত পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয়দের তৎপরতায় দ্রুত আগুন নেভানো সম্ভব হয়। বাসটি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এর কিছুক্ষণ পর মধ্য বাড্ডা ইউ-লুপের নিচে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলিফ এন্টারপ্রাইজের একটি স্টাফ বাসে আগুন দেওয়া হয়। রাত ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার সামনে জব্দ করে রাখা একটি পিকআপে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। ফলে বাসে আগুনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয় থানার সামনে রাখা যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা।
ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে দুই শতাধিক চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
ডিএমপির জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানান, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেকপোস্টের পাশাপাশি নিয়মিত পুলিশি টহলও চলছে। সন্দেহভাজনদের শনাক্তে কাজ করছে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট।
পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানীতে প্রবেশের চারটি পথেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, উড়ালসড়ক ও কেপিআই এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত সদস্য।
নাশকতা ও অপরাধ ঠেকাতে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৩ বা এসআরবি-৩-এর তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রধান সড়ক ও জনবহুল এলাকায় বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে চালানো হচ্ছে বিশেষ তল্লাশি।
এসআরবি-৩-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী জানান, সার্বক্ষণিক চেকপোস্টের পাশাপাশি রোবাস্ট পেট্রোলিং ও মোটরসাইকেল পেট্রোলিং জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধী চক্রের ওপর গোয়েন্দা নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে।
তবে সাধারণ মানুষের চলাচলে যাতে নিরাপত্তা কার্যক্রমের কারণে অযথা বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়েও দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি রাজধানীতে পৃথক অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। এ সময় ৪৭টি মামলা করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের মধ্যে মিরপুর বিভাগে সর্বোচ্চ ১২০ জন। তেজগাঁওয়ে ৯২, মতিঝিলে ৭৬, ওয়ারীতে ৬৪, উত্তরা বিভাগে ৪৬, গুলশানে ৩৭, লালবাগে ৩৪, রমনায় ৩০ এবং গোয়েন্দা বিভাগে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অভিযানে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ১০টি গুলি, তিনটি চাপাতি, পাঁচটি চাকু এবং বিস্ফোরিত ককটেল থেকে ৫৩টি লোহার পেরেক উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৯৪ কেজি ৩৫০ গ্রাম গাঁজা, ১১ হাজার ১৬৭টি ইয়াবা, ১২১ দশমিক ৩ গ্রাম হেরোইন, তিন বোতল বিদেশি মদ ও ২০ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, পাঁচটি মোবাইল ফোন ও ৭ হাজার ২০০ টাকা।
শুধু ঢাকাতেই নয়, শনিবার রাতে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের ওভারব্রিজের নিচেও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। রাত ৯টার পর এ ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও বিস্ফোরণের শব্দে বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এখন মূল নজর জড়িতদের শনাক্ত ও ঘটনার ধরন নির্ধারণে। শুক্রবারের বিস্ফোরণগুলোর সঙ্গে শনিবারের বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাগুলোর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ জানিয়েছে, ইতোমধ্যে সন্দেহভাজনদের শনাক্তে কাজ শুরু হয়েছে। ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
একদিকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট ও তল্লাশি, অন্যদিকে বাড়তি টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি-সব মিলিয়ে রাজধানীতে এখন নিরাপত্তার কড়াকড়ি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে এ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বেড়েছে নাশকতা
RELATED ARTICLES
Recent Comments
on Hello world!




