Thursday, October 1, 2026
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
Homeঅপরাধ ও দুর্নীতিমাঝ-আকাশে ফ্লাই দুবাইয়ের ভারতীয় পাইলটকে আক্রমণ, হামলার নেপথ্যে কি?

মাঝ-আকাশে ফ্লাই দুবাইয়ের ভারতীয় পাইলটকে আক্রমণ, হামলার নেপথ্যে কি?

অভিজিৎ মূখার্জি, বিশেষ প্রতিবেদক (ভারত): ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ফ্লাইদুবাইয়ের আক্রমণকারী সেই সহকারী পাইলট ইসলামপন্থী উগ্রবাদী মতাদর্শে দীক্ষিত। অভিযোগ, ওই যুবক বিমানটিকে ‘ক্র্যাশ’ করাতে চেয়েছিলেন। নিজে ছিলেন আত্মঘাতী মনোভাবাপন্ন। ধরা পড়ার পর ককপিটে চিৎকার করে তিনি বার বার বলছিলেন, ‘আমাকে মেরে ফেলো’। প্রাথমিক ভাবে ইজ়রায়েলের দাবি, আক্রমণকারী যুবক ওমানের নাগরিক। তবে ওমান কর্তৃপক্ষ এখনও সে বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। ফক্স নিউজ়কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ‘‘আমরা জানি ও ইসলামপন্থী উগ্রবাদী মতাদর্শে দীক্ষিত। ওর ব্যক্তিগত তথ্য থেকে এটা আমরা জানতে পেরেছি। ওকে যখন ধরে ফেলা হয়েছিল, ‘আমাকে মেরে ফেলো, মেরে ফেলো’ বলে ও চিৎকার করছিল। এটা স্পষ্ট যে, ও আত্মহত্যা করতেই চেয়েছিল। তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। খুব সম্ভবত ও বিমানটিকে মাটিতে ফেলে দিতে চাইছিল। ওর অতীত ঘাঁটলে ইসলামপন্থী প্রবণতা, উগ্রবাদ পাওয়া গিয়েছে। এটা বেশ জোরালো একটা সূত্র বলে আমার মনে হয়। তবে আমি এখনই চূড়ান্ত কিছু বলতে চাই না। আপাতত এই ইঙ্গিত পেয়েছি।’’
হামলার নেপথ্যে কি ইরানের কোনও যোগ রয়েছে? নেতানিয়াহু জোর দিয়ে তা বলতে চাননি। তিনি জানিয়েছেন, হামলাকারীকে নিয়ে আরও বিশদে তদন্ত করবেন তাঁরা। তাঁর কোনও সহযোগী ছিলেন কি না, নেপথ্যে ইরানের হাত ছিল কি না, খতিয়ে দেখা হবে। এখনই তা বলা সম্ভব নয়। তবে শীঘ্রই সব জানা যাবে বলে তিনি আশাবাদী। বিমানের ওই ঘটনার তদন্ত করছেন আমিরশাহি কর্তৃপক্ষ। সৌদি আরব গ্রেফতার করেছে অভিযুক্তকে। তবে ইজ়রায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং শিন বেট পৃথক তদন্ত শুরু করে দিয়েছে। সে দেশের দুই নিরাপত্তা আধিকারিকের দাবি, প্রাথমিক ভাবে তাঁরা মনে করছেন ওই পাইলট একার উদ্যোগেই যা করার করেছেন। তাঁর নেপথ্যে কোনও সংগঠনের হাত নেই। তবে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন ইজ়রায়েলের এক আধিকারিক।
বুধবার সকালে দুবাই থেকে তেল আভিভের দিকে যাচ্ছিল ফ্লাইদুবাই সংস্থার বিমানটি। ভিতরে ছিলেন ১৮০ জন যাত্রী। বিমান চালাচ্ছিলেন ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। অভিযোগ, বিমান মাঝ-আকাশে থাকাকালীন ককপিটের ভিতর তাঁকে ছুরি মারা হয়। সহকারী পাইলট ছুরির একাধিক কোপে তাঁকে জখম করেন। এর ফলে বিমান সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে ১৪ হাজার ফুট নীচে নেমে যায় বিমানটি। পরে যাত্রী এবং বিমানের অন্য কর্মীরা ককপিটে ঢুকে অভিযুক্তকে বাধা দেন এবং জখম ক্যাপ্টেনকে উদ্ধার করেন। বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। একে ‘হাইজ্যাকের চেষ্টা’ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ। ইজ়রায়েল আগেই গোটা ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদী হামলার তকমা দিয়ে দিয়েছে। অভিযোগ, ওই বিমানে ইজ়রায়েলি নাগরিকের সংখ্যাই ছিল বেশি। তাঁদের হত্যা করা হামলাকারীর উদ্দেশ্য ছিল। সৌদি বা আমিরশাহি কর্তৃপক্ষ এখনও সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।
উল্লেখ্য, ওমানের সঙ্গে ইজ়রায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক খুব মধুর নয়। তা সত্ত্বেও তেল আভিভগামী বিমানের সহকারী পাইলট হিসেবে কেন ওমানি নাগরিককে নিযুক্ত করা হল, প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। ফ্লাইদুবাই বিমান সংস্থা নিজেদের মতো তদন্ত শুরু করেছে। তা শেষ না-হওয়া পর্যন্ত তারা ইজ়রায়েলে আর কোনও বিমান পাঠাবে না।
গুজরাতি বংশোদ্ভূত স্মিত ২০২২ সালে ফ্লাইদুবাই সংস্থায় যোগ দিয়েছিলেন। ককপিটের মধ্যে আক্রান্ত হয়েও সাহস হারাননি তিনি। জখম হাত নিয়ে লড়াই চালিয়ে যান সহকারীর সঙ্গে। সেই অবস্থাতেই কোনও রকমে দরজা খোলেন। তখন বাকি যাত্রীরা ককপিটে ঢুকে তাঁকে উদ্ধার করেন। বেঁধে ফেলা হয় আক্রমণকারীরা। গুরুতর জখম অবস্থায় সৌদির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন স্মিত। সেখানকার হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হয়। শারীরিক পর্যবেক্ষণে রাখার পর বৃহস্পতিবার তাঁকে দুবাইতে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। আপাতত তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন। তাঁর পরিবারও সেখানে রয়েছে।
স্মিতের সাহস এবং তৎপরতার প্রশংসা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। ক্যাপ্টেনের পরিবারের সঙ্গেও মোদী কথা বলেছেন। এ ছাড়া, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু স্মিতকে কুর্নিশ জানিয়েছেন। গুজরাত সরকার তাঁকে ‘বিশিষ্ট গুজরাত গরিমা’ সম্মান দিয়েছে। মোদী সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর নায়ক। ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে গুরুতর জখম হয়েও তিনি অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হননি।” রাষ্ট্রপতি জানান, গোটা দেশ স্মিতের জন্য গর্বিত। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘পাইলট খুব খারাপ অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে বিচারবুদ্ধি হারাননি। তিনি একজন নায়ক।” নেতানিয়াহু আবার লিখেছেন, ‘‘ছুরিবিদ্ধ হয়েও উনি লড়াই করে গিয়েছেন। হামলা আটকানোর চেষ্টা করেছেন, ককপিটের দরজা খুলে দিয়েছেন। এর ফলে যাত্রী এবং বিমানকর্মীরা ভিতরে ঢুকে হামলাকারীকে আটকাতে পেরেছিলেন।
ককপিটে ধারালো অস্ত্র কোথা থেকে পেয়েছিলেন সহকারী পাইলট? মনে করা হচ্ছে, ‘ক্র্যাশ অ্যাক্স’ দিয়েই স্মিতকে আঘাত করা হয়। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের বিধি অনুযায়ী, ওই কুঠার ককপিটে রাখা আবশ্যক। বিমান যখন কারখানায় তৈরি হয়, তখনই তার ককপিটে তা রেখে দেওয়া হয়। আগুন লাগলে বা জরুরি পরিস্থিতিতে বাধা সরানোর কাজে তা ব্যবহৃত হয়।
ফ্লাইদুবাইয়ের ওই বিমানে ছিলেন দন্ত চিকিৎসক শোতা মোসায়েভ। ককপিটের দরজা খোলার পর জখম পাইলটকে টেনে বাইরে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘‘পাইলটের মাথায়, হাতে গভীর ক্ষত হয়ে গিয়েছিল। প্রচুর রক্তপাতও হয়। একটা সময় অচৈতন্য হয়ে পড়েন।’’ “মাঝ-আকাশে ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে আক্রমণের নেপথ্য কারণ হিসেবে উগ্রপন্থী ইসলামি আদর্শে দীক্ষিত হওয়া ও আত্মঘাতী জিহাদি হামলার মানসিকতাকে প্রাথমিকভাবে দায়ী করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 ফ্লাইটে ওমানি বংশোদ্ভূত সহ-পাইলট (Co-pilot) আচমকা প্রধান পাইলট (ক্যাপ্টেন) ভারতের স্মিত মচ্ছরকে ছুরিকাঘাত করেন এবং বিমানটি ক্র্যাশ করানোর চেষ্টা করেন”।
হামলার মূল নেপথ্য কারণ ও পরিস্থিতি:
  • জিহাদি আদর্শ ও ইসরায়েল-বিদ্বেষ: ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, হামলাকারী সহ-পাইলট উগ্র ইসলামি মতাদর্শে দীক্ষিত (Radical Islamist Indoctrination) হয়েছিলেন এবং তিনি স্পষ্টতই আত্মঘাতী ও উগ্র ইসরায়েল-বিদ্বেষী মানসিকতা থেকে ১৭৪ জন যাত্রীসহ পুরো বিমানটি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন।
  • ভয়াবহ পরিস্থিতি ও সাহসিকতা: আক্রমণের পর বিমানটি মাত্র ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের মধ্যে আকাশ থেকে প্রায় ১৪,০০০ ফুট নিচে নেমে যায়, যার ফলে যাত্রীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়ায়। রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যাপ্টেন স্মিত ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হলে বিমানের কয়েকজন ইসরায়েলি যাত্রী এবং অফ-ডিউটি পাইলটরা মিলে হামলাকারীকে শক্ত হাতে কাবু করেন ও বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন।
  • বর্তমান অবস্থা: বিমানটি পরবর্তীতে সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে। হামলাকারী সহ-পাইলটকে গ্রেপ্তার করে তদন্ত চালানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক তদন্তকারী দল এই নজিরবিহীন ঘটনার পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সরাসরি সম্পৃক্ততা বা ইরান-যোগ রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments