স্বাস্থ্য ডেস্ক রিপোর্ট: বাঙালি বাড়িতে আগের রাতে রান্না করা ভাত পরের দিন গরম করে খাওয়ার অভ্যাস খুবই প্রচলিত। আগের রাতে রান্না করা ভাত সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে পরের দিন গরম করে খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এটি খাবারের অপচয় রোধ করার একটি ভালো উপায় হলেও, এই অভ্যাসটি কি স্বাস্থ্যের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ? বিজ্ঞান এই বিষয়ে কী সতর্কবার্তা দিচ্ছে, তা জেনে নেওয়া যাক বিপদ কোথায়? বাঙালিদের ভাত ছাড়া মুখ রোচে না। বেশিপভাগ বাড়িতেই আগেরদিনের ভাত পরেরদিন গরম করে খাওয়ার চল আছে। আবার কখনও সকালের ভাত রাতেও গরম করে খাওয়া হয়। তবে জানেন কি, ভাত বারবার গরম করলে তাতে বিষক্রিয়া হতে পারে। তাই এমন কাজ ভুলেও করবেন না। বরং, যতটা প্রয়োজন ঠিক ততটা ভাতই রান্না করার চেষ্টা করুন।
ভাত রান্নার পর যদি দীর্ঘ সময় সাধারণ তাপমাত্রায় সেটা রাখা থাকে তাহলে ‘ব্যাসিলাস সিরিয়াস’ নামক এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে থাকে। । সেই ভাত আবার গরম করা হলে ওই ব্যাকটেরিয়া বিষাক্ত হয়ে যায়। আর তারপর তা খেলে ডায়রিয়া, বমির সহ নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কর্মজীবীদের রান্নাবান্নার পেছনে খুব বেশি সময় ব্যয় করার সুযোগ হয় না অনেক সময়। একদিন রান্না করে সেটা বেশ কয়েকদিন ফ্রিজে রেখে খাই আমরা। আবার সকালে ভাত রান্না করে সেটি রাতে গরম করে খাই। তবে এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কেবল গরম ভাত খেলেই হবে না, খেতে হবে টাটকা ভাত। এমন তথ্য জানিয়েছে ব্রিটেনের ‘ফুড স্ট্যান্ডার্ড এজেন্সি’র একটি গবেষণা।
- ব্যাসিলাস সেরিয়াস: বিজ্ঞানীদের মতে, আগের রাতে রান্না করা ভাত পরের দিন গরম করে খাওয়ার ক্ষেত্রে মূল সমস্যা ভাতটিকে কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে- তার ওপর নির্ভর করে। এই সমস্যার জন্য দায়ী একটি বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যার নাম ব্যাসিলাস সেরিয়াস।
- ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি: এই ব্যাকটেরিয়াটি সাধারণত রান্না করা চালের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় (স্পোর রূপে) থাকে। রান্না করা ভাতে ‘ব্যাসিলাস সিরিয়াস’ (Bacillus cereus) নামক ব্যাকটেরিয়ার স্পোর বা রেণু বেঁচে থাকতে পারে।
- তাপমাত্রা বিপদ: যখন ভাত রান্না করা হয়, তখন বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়া মারা গেলেও, কিছু স্পোর বেঁচে থাকে। রান্না করা ভাত যদি খুব ধীরে ধীরে ঘরের তাপমাত্রায় ঠান্ডা হয় বা দীর্ঘ সময় ধরে (বিশেষত ৪°C থেকে ৬০°C তাপমাত্রার মধ্যে, যাকে ‘বিপদ অঞ্চল’ বলা হয়) রাখা হয়, তবে
- বিপজ্জনক টক্সিন: এই টক্সিনগুলিই মূলত পেটের সমস্যার সৃষ্টি করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভাত পুনরায় গরম করলেও এই টক্সিনগুলো নষ্ট হয় না।
- কী হতে পারে: আগের রাতের ভাত যদি ঠিকমতো সংরক্ষণ করা না হয় এবং তাতে ব্যাসিলাস সেরিয়াস টক্সিন তৈরি হয়, তবে তা খেলে:
- ফুড পয়জনিং: এটি ‘রাইস সিনড্রোম’ নামে পরিচিত এক ধরনের খাদ্য বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
- লক্ষণ: এর সাধারণ লক্ষণগুলি হলো বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া এবং বমি হওয়া।
- তাপমাত্রা ও বিষক্রিয়া: ভাত রান্না করার পর বেশিক্ষণ ঘরের সাধারণ তাপমাত্রায় খোলা অবস্থায় রেখে দিলে এই স্পোরগুলো থেকে দ্রুত ব্যাকটেরিয়া জন্মায় এবং বিষাক্ত টক্সিন তৈরি করে। এই টক্সিন অনেক সময় পুনরায় ভালোমতো গরম করলেও নষ্ট হয় না।
- শারীরিক সমস্যা: এমন ভাত খেলে বমি, পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়ার মতো ফুড পয়জনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
বিজ্ঞানসম্মতভাবে নিরাপদ উপায়ে গরম করার কৌশল- আগের রাতের ভাত পরের দিন খাওয়া যেতে পারে, যদি কিছু সহজ কৌশল মেনে চলা হয়:
- দ্রুত ঠান্ডা করুন: ভাত রান্না করার এক ঘণ্টার মধ্যে, এটিকে অবশ্যই দ্রুত ঠান্ডা করতে হবে। গরম ভাত ফ্রিজে রাখলে তা অনেকক্ষণ ধরে ‘বিপদ অঞ্চল’-এর তাপমাত্রায় থাকে না। ছোট পাত্রে ছড়িয়ে রাখলে তা দ্রুত ঠান্ডা হবে।
- সঠিক সংরক্ষণ: ঠান্ডা হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে ভাত এয়ারটাইট (বায়ুরোধক) পাত্রে ভরে ফ্রিজে (৪°C তাপমাত্রার নিচে) সংরক্ষণ করুন।
- একবারই গরম: ভাত একবারই গরম করুন এবং খাওয়ার আগে নিশ্চিত করুন যে তা ভালোভাবে গরম হয়েছে (কমপক্ষে ৭৪°C তাপমাত্রায়)। বারবার গরম করা থেকে বিরত থাকুন।
সমস্যাটি ভাত গরম করার মধ্যে নয়, বরং ভাতকে কীভাবে এবং কতক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা হচ্ছে- তার ওপর নির্ভর করে। সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি মেনে চললে আগের রাতের ভাত খাওয়া নিরাপদ।



